বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩
শিরোনাম

চুয়াডাঙ্গা বিএডিসি ফার্মের পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে মাদকের ‘স্বর্গরাজ্য’    


  মো: মিনারুল ইসলাম

প্রকাশ :  ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:২০ রাত

চুয়াডাঙ্গায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ফার্মের অবহেলা, উদাসীনতা ও যথাযথ তদারকির অভাবে সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি এখন অপরাধের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফার্মের অভ্যন্তরে ও সীমানা ঘেঁষে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুরনো পরিত্যক্ত স্টাফ কোয়ার্টারগুলো মাদকসেবী ও উঠতি বয়সী কিশোর গ্যাংয়ের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বা ‘স্বর্গরাজ্য’ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। চরম নিরাপত্তাহীনতায় এলাকাবাসী
 
দিন-রাত সমানতালে চলা কথিত এই মাদক সিন্ডিকেটের কারণে আশপাশের সাধারণ বাসিন্দা, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও পথচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
 
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঐতিহ্যবাহী ও শান্ত এই সরকারি খামার এলাকাটি ধীরে ধীরে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হলেও বিএডিসি কর্তৃপক্ষ রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা বিএডিসি ফার্মের বেশ কয়েকটি আবাসিক কোয়ার্টার বহু বছর ধরে অবিন্যস্ত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কার না হওয়ায় ভবনগুলোর দরজা, জানালা, চৌকাঠ ও মূল্যবান লোহার গ্রিল অনেক আগেই চুরি হয়ে গেছে।
 
বর্তমানে ফাঁকা, ভাঙাচোরা এবং ঝোপঝাড় ও লতাপাতায় ঘেরা এসব ভবনই অপরাধীদের জন্য উপযুক্ত আড়াল ও কথিত ‘সেফজোন’ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের দাবি, শুধু চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকা বা শহরের মাদকসেবীরাই নয়, বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন এসে এসব পরিত্যক্ত কক্ষে জড়ো হয়।
 
তাদের অভিযোগ, দিনের আলোতেই এসব পরিত্যক্ত কক্ষের ভেতরে ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও বিভিন্ন তরল মাদকের অবাধ সেবন ও কেনাবেচা চলে। আর সন্ধ্যার অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে কোয়ার্টারগুলোর ভয়াবহতা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন এসব স্থান পেশাদার জুয়াড়ি, ছিনতাইকারী ও ভাসমান অপরাধীদের মূল আস্তানায় পরিণত হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
 
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিএডিসি ফার্ম এলাকায় নতুন করে ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতিও তৈরি হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার উঠতি বয়সী স্কুল-কলেজগামী যুবকেরা সহজেই এই চক্রের ফাঁদে পড়ে মাদকের মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে।
 
একই সঙ্গে এলাকায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে এই অপরাধী চক্র বিএডিসি এলাকার মূল্যবান সরকারি গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে, বৈদ্যুতিক তার চুরি করছে এবং আশপাশের বাসাবাড়িতে গভীর রাতে ও ভরদুপুরে ছোটখাটো চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
 
একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বিএডিসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এভাবে মাদকের হাট বসবে, এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কর্তৃপক্ষ সব দেখেও না দেখার ভান করে আছে। আমরা এই ভবনগুলো হয় দ্রুত সংস্কার করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা করার, না হলে একবারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটার আগে প্রশাসন ব্যবস্থা নিক।”
 
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি এত বড় একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দিনের পর দিন এমন অনৈতিক, অবৈধ ও সমাজবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড চললেও বিএডিসি ফার্ম কর্তৃপক্ষের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই।
 
কর্তৃপক্ষের এই নীরবতা ও উদাসীনতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চুয়াডাঙ্গার সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিক মহল।
 
তাদের মতে, একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা এবং সেখানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বিষয় নয়।
 
স্থায়ী সমাধান চেয়ে এলাকাবাসীর দাবি, শুধুমাত্র সাময়িক বা লোকদেখানো পুলিশি অভিযান চালিয়ে এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য মূল উদ্যোগ নিতে হবে বিএডিসি কর্তৃপক্ষকেই।
 
 
সচেতন মহলের মতে, বিএডিসি যদি অনতিবিলম্বে তাদের পরিত্যক্ত ভবনগুলো ভেঙে ফেলে জায়গাটি পরিষ্কার করে, ফার্মের সীমানাপ্রাচীর আরও উঁচু ও সুরক্ষিত করে এবং পুরো খামার এলাকায় পর্যাপ্ত আধুনিক আলোর (স্ট্রিট লাইট) ব্যবস্থা করে, পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তা প্রহরী (গার্ড) জোরদার করে—তবেই এই ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ ফার্মটিকে মাদক ও অপরাধমুক্ত করা সম্ভব।
 
চুয়াডাঙ্গার সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত