২৫ কোটি গাছের চারা বিতরণ কর্মসূচি: কেবল রোপণ নয়, টিকিয়ে রাখার জন্যও কাজ করতে হবে
মো: জায়েজুল ইসলাম
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩৬ দুপুর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছের চারা বিতরণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। সে অনুযায়ী সারা দেশে প্রতি বছর ৫ কোটি গাছের চারা বিতরণ করতে হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে দেশের ৬৪টি জেলার ৫০০ উপজেলায় প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ করে গাছের চারা বিতরণ করতে হবে।
অর্থাৎ, এক বছরে গড়ে প্রতিটি উপজেলায় ১ লাখ গাছের চারা রোপণ করা হবে। আর পাঁচ বছরে রোপণ করা হবে ৫ লাখ চারা। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, আনুষঙ্গিক ব্যয় ছাড়া প্রতিটি চারার সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য গড়ে ৫০ টাকা ধরলেও ২৫ কোটি চারার জন্য পাঁচ বছরে ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। সে হিসেবে প্রতি উপজেলায় পাঁচ বছরে ব্যয় হবে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা।
বিশাল এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে নেত্রকোনার পূর্বধলায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মৌসুমের শুরুতে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা বিতরণের মাধ্যমে কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। কর্মসূচির উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. রহিম তালুকদার, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আলহাজ বাবুল আলম তালুকদার, উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান ফকিরসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
উদ্বোধনী কার্যক্রমের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছের চারা বিতরণের একটি মহতী উদ্যোগ শুরু হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তবে বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে একটি নির্মম সত্য সামনে আসে—চারা বিতরণের সময় জনগণের মধ্যে যে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা যায়, পরবর্তী সময়ে সঠিক পরিচর্যার অভাবে তার বড় অংশই অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে চারা বিতরণ করা হলেও বনায়নের মূল লক্ষ্যটি অধরাই থেকে যাচ্ছে।
এই মহা-উদ্যোগকে সফল করতে কেবল ‘চারা রোপণ’ নয়, ‘চারা টিকিয়ে রাখা’র ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া প্রয়োজন।
চারা রোপণের পর তদারকির অভাবে মরে যায় চারা
চারা রোপণের পর বেড়া দেওয়া, নিয়মিত পানি দেওয়া এবং পোকামাকড় থেকে রক্ষার জন্য যথাযথ যত্ন নিতে হয়। গরু-ছাগলের আক্রমণ থেকে চারা রক্ষার জন্য বেড়া দিতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থও ব্যয় করতে হয়, যা বেশির ভাগ চারা গ্রহীতা করেন না। ফলে অনেক চারা অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যায় এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
এ কারণে প্রকল্পটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে—
১। চারা বিতরণের সময় অপেক্ষাকৃত বড় ও সুস্থ চারা সরবরাহ করতে হবে। এতে চারা রোপণ ও সংরক্ষণ করা তুলনামূলক সহজ হবে।
২। চারার সঙ্গে বেড়া ও খুঁটির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এটি প্রকল্পের অর্থ থেকে অথবা চারা গ্রহীতার পক্ষ থেকে করা যেতে পারে। এতে চারা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা কমবে।
৩। কাকে বা কোন প্রতিষ্ঠানকে কতটি চারা দেওয়া হচ্ছে, তার একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে। পরবর্তীতে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে চারাগুলো আছে কি না এবং কী অবস্থায় রয়েছে, সে বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া সম্ভব হবে। সম্ভব হলে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে চারা রোপণের স্থানকে অ্যাপ বা জিও-ট্যাগিংয়ের আওতায় আনা যেতে পারে। এতে নির্দিষ্ট সময় পরপর চারার বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।
৪। ইউনিয়ন জনপ্রতিনিধি, সরকারি প্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, যুবসমাজ ও সমাজসচেতন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডভিত্তিক বৃক্ষ রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে কার্যক্রমকে মনিটরিং ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হবে।
৫। যিনি বা যারা সবচেয়ে বেশি চারা বাঁচিয়ে রাখতে পারবেন, তাঁদের জন্য বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে চারা সংরক্ষণে আগ্রহ বাড়বে।
৬। সারা দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, ক্লিনিক, ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ও ভূমি অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা যেতে পারে।
৭। চারা বিতরণের পূর্বে আলোচনা সভা বা লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে চারা গ্রহীতাদের প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন, পরিচর্যার পদ্ধতি ও শর্তাবলি সম্পর্কে জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
৮। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা পর্যায়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
এদিকে, পূর্বধলা উপজেলায় মৌসুমের শুরুতে সামান্য কিছু চারা বিতরণ করা হলেও পরে আর তেমন কার্যক্রম দেখা যায়নি। মৌসুমও শেষ হয়ে আসছে। উপজেলা পর্যায়ে এত বড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে আরও অনেক চারা রোপণ করতে হবে।
তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি এনজিও, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন কোম্পানিকেও চারা দান ও রোপণ কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ বিশাল কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও সফল করা সম্ভব।
শেষ কথা হলো—শুধুমাত্র সংখ্যার গুরুত্ব না দিয়ে চারা বিতরণের পাশাপাশি সংরক্ষণ ও তদারকিতেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ২৫ কোটি চারা বিতরণ করে যদি মাত্র ১ কোটি চারা বাঁচিয়ে রাখা যায়, তার চেয়ে ১ কোটি চারা বিতরণ করে ১ কোটি চারা বাঁচিয়ে রাখা অনেক বেশি কার্যকর ও ফলপ্রসূ হবে। এতে শুভঙ্করের ফাঁকি রোধ হবে, অর্থের অপচয় কমবে, চারার টিকে থাকার হার বাড়বে এবং সফল হবে এই মহতী উদ্যোগ। অন্যথায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।







