লাইক-কমেন্টের ফাঁদে আটকে যাচ্ছে জীবন লগ-আউট করুন, লাইফ-ইন করুন
জাকির আহমদ খান কামাল
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৫ দুপুর
হিসাব করলে দেখা যাবে, আমরা প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা করে মোবাইল স্ক্রল করি। মানে মাসে ১৮০ ঘণ্টা! এই সময়ে চাইলে একটা নতুন ভাষা শেখা যায়, একটা বই লেখা যায়, বা নিজের গ্রামটা ঘুরে দেখা যায়। কিন্তু আমরা সময়টা দিচ্ছি স্ক্রিনকে। বিনিময়ে আমরা কী পাচ্ছি?
আসলে আমরাই এখন পণ্য হয়ে গেছি। ব্যাপারটা একটু খোলাসা করি।
ফেসবুক-ইউটিউবের মতো কোম্পানিগুলো চলে বিজ্ঞাপনের টাকায়। আপনি যত বেশি সময় অ্যাপে থাকবেন, ওরা তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখাতে পারবে। তাই ওরা চায় আপনাকে যে কোনোভাবে আটকে রাখতে। এজন্য ওরা বিজ্ঞানীদের দিয়ে এমন ফাঁদ বানিয়েছে—যেমন টান দিলেই নতুন ভিডিও আসে, রাত ১২টায় নোটিফিকেশন আসে, আপনার বন্ধু লাইভে আছে একটা ভিডিও শেষ হলেই আরেকটা অটো চালু হয়ে যায়। আমরা ভাবি আমরাই চালাচ্ছি, আসলে আমাদেরকে চালানো হচ্ছে।আমরা কি সবাই "ডিজিটাল লেবার" হয়ে গেছি?
এতে আমাদের তিনটা বড় ক্ষতি হচ্ছে।
১. আমরা ভুলতে বসেছি গভীরভাবে ভাবা:-
১৫ সেকেন্ডের ভিডিও দেখতে দেখতে আমাদের মাথাও ১৫ সেকেন্ডের হয়ে গেছে। এখন ১০ মিনিটের একটা খবর পড়তেও বিরক্ত লাগে। ছাত্ররা ক্লাসে ২০ মিনিট মন দিতে পারে না। কিন্তু জীবনের বড় বড় কাজ—পড়াশোনা, ব্যবসা, সম্পর্ক—কোনোটাই ১৫ সেকেন্ডে হয় না। গভীর মনোযোগ ছাড়া বড় কিছুই হবে না।
২. আমরা বিভক্ত হয়ে যাচ্ছি:-
ফেসবুক আপনাকে শুধু তাই দেখাবে যা আপনি পছন্দ করেন। আপনি যদি একটা রাজনৈতিক দল পছন্দ করেন, সে শুধু সেই দলের ভালো খবর দেখাবে। অন্য দলের ভালো কথা আপনার সামনে আসবেই না। ফলে আমরা সবাই নিজের মতো একটা ছোট জগতে আটকে যাচ্ছি। অন্যের মতামতকে আমাদের শত্রু মনে হচ্ছে। রাস্তায়, চায়ের দোকানে, পরিবারে—সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
৩. মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে:-
ফেসবুকে ঢুকলে মনে হয়—সবাই সুখে আছে, ঘুরছে, খাচ্ছে, সফল হচ্ছে। শুধু আমিই পিছিয়ে আছি। এই তুলনা থেকে জন্ম নিচ্ছে হতাশা, দুশ্চিন্তা, ঘুম না হওয়া, মন খারাপের মত বিষয় গুলোর ভয়াবহতা। সেই সাথে বাড়ছে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে অশান্তি আর অসভ্যতা। আমরা হাজার বন্ধুর সাথে যুক্ত, অথচ দিনশেষে ভীষণ একা।
তাহলে কি মোবাইল ছুড়ে ফেলে দেব? না, তা সম্ভবও নয়, উচিতও নয়। এই মোবাইল দিয়েই তো আমরা ব্যবসা করছি, বিদেশে থাকা মায়ের সাথে কথা বলছি, আন্দোলনের খবর জানছি। দরকার হলো লাগাম টানা।
কীভাবে সম্ভব?
প্রথম কাজ:-
সময় বাঁধুন। ঘুম থেকে উঠে প্রথম ১ ঘণ্টা এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগের ১ ঘণ্টা মোবাইল থেকে দূরে থাকুন। দেখবেন মাথা অনেক হালকা লাগছে।
দ্বিতীয় কাজ:-
নোটিফিকেশন বন্ধ করুন। গেম, লাইক, কমেন্টের টুংটাং শব্দ বন্ধ করে দিন। শুধু কল আর জরুরি মেসেজের শব্দ চালু রাখুন। আপনি ঠিক করবেন কখন ফোন দেখবেন, ফোন ঠিক করবে না।
তৃতীয় কাজ:-
প্রশ্ন করুন। ফোনটা হাতে নেওয়ার আগে নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করুন—"আমি কেন ফোনটা ধরলাম?" উত্তর না থাকলে রেখে দিন।
চতুর্থ কাজ:-
ফিড পরিষ্কার করুন। যেসব পেজ দেখলে আপনার রাগ হয়, হিংসা হয়, মন খারাপ হয়—আজই আনফলো করুন। ফুলের বাগান থেকে আগাছা পরিষ্কার না করলে যেমন ফুল ফোটে না।
স্কুল-কলেজেও এখন শেখানো দরকার,
কীভাবে স্মার্টভাবে ইন্টারনেট চালাতে হয়। আর কোম্পানিগুলোকেও বাধ্য করতে হবে যেন তারা "আর কতক্ষণ দেখবেন?" এমন রিমাইন্ডার দেয়।
মনে রাখবেন, আপনার মনোযোগই আপনার জীবন। আপনি সারাদিন কী দেখছেন, কী ভাবছেন—তাই দিয়েই আপনার ভবিষ্যৎ তৈরি হচ্ছে। মাঝে মাঝে ফোনটা রেখে একটু আকাশের দিকে তাকান, পরিবারের সাথে গল্প করুন, বইয়ের পাতা উল্টান। দেখবেন, আসল জীবনটা স্ক্রিনের বাইরেই পড়ে আছে।
আপনার ব্রেইন হ্যাক হয়ে গেছে, টেরই পাচ্ছেন না। লাইক-কমেন্টের দুনিয়ায় সেই মনোযোগটা অন্য কাউকে বিনা পয়সায় দিয়ে দেবেন না।



