নির্বাচনী প্রচারণায় ভোটের মাঠে লাইক কমেন্টের লড়াই
জাকির আহমদ খান কামাল
প্রকাশ : ৩১ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০৪ দুপুর
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে নিয়ে সারা দেশব্যাপী চলছে নির্বাচনী প্রচারণা সেই সাথে উত্তেজনা। শুরু হয়েছে ভোটের কাউন্ট-ডাউন।
নির্বাচন এলে আগে শোনা যেত—ভাই, ভোটটা দিয়েন। এখন শোনা যায়—ভাই, রিলটা শেয়ার করেন। উঠান বৈঠকের জায়গা দখল করেছে রিং লাইট, পোস্টারের বদলে এসেছে ফিল্টার আর স্লো-মোশন ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঝলকানিতে ভোটের আবেদন যেন পেছনের সারিতে—সামনের সারিতে শুধু প্রার্থীর দৃষ্টি-আকর্ষণের প্রতিযোগিতা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের টাইমলাইনে ঢুকলেই দেখা যায়—প্রার্থী দাঁড়িয়ে আছেন সেতুর ওপর, পাশে অস্তগামী সূর্য, আরেকজন চা খাচ্ছেন শ্রমিকের সঙ্গে, ক্যাপশনে লেখা "আপনাদেরই একজন"। কেউ আবার ড্রোন ক্যামেরায় পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে প্রমাণ করছেন, তিনি শুধু জনপ্রতিনিধি নন, আকাশপথেরও প্রতিনিধি।
প্রচারকর্মীরা এখন লিফলেট হাতে নিয়ে ঘোরেন। আগে কর্মসূচি মানে ছিল উঠান বৈঠক, এখন মানে "লাইভে যাবো স্যার?"। বক্তৃতার আগে মাইকের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—নেটওয়ার্ক আছে তো? ভোটের আবেদন যেখানে দুই মিনিটে বলা যেত, সেখানে দশ মিনিট ব্যয় হয় কোন অ্যাঙ্গেল থেকে মুখটা সবচেয়ে দেশপ্রেমিক দেখাবে তা ঠিক করতে।
ক্যাপশন লেখার শিল্পও কম জটিল নয়। “ইনশাআল্লাহ বিজয়ী হবো”—এই সাধারণ বাক্য এখন আর চলে না। সঙ্গে থাকতে হয় পাইপে বাধা অন্তত তিনটি পতাকা, দুটি হাততালি আর একটি আগুনের ইমোজি।
কেউ কেউ এখন আর ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টায় নেই—বরং সোশ্যাল মিডিয়ার প্ল্যাটফর্মই যেন আসল নির্বাচন কমিশন। লাইক, শেয়ার আর ভিউয়ের হিসাবেই জনপ্রিয়তার মাপকাঠি নির্ধারিত হচ্ছে, আর রাজনৈতিক বার্তাও তাই ছাঁকা হচ্ছে ভাইরাল টপিকের ছাঁকনিতে। জনতার প্রশ্ন, দাবি কিংবা বাস্তব সমস্যার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কোন বাক্যটি বেশি ভাইরাল হবে, কোন ছবি বেশি রিচ দেবে, কিংবা কোন ব্যঙ্গটি রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসবে। ফলে রাজনীতির মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন আর শুধু প্রার্থী বনাম প্রার্থী নয়—অদৃশ্য এক ডিজিটাল ফর্মুলার সঙ্গে পাল্লা দিয়েই চলছে ক্ষমতার দাপট।
ব্যঙ্গর বিষয় হলো, অনেক সময় ভিডিও দেখে বোঝা যায় না প্রার্থী কী করতে চান—শুধু বোঝা যায় তিনি কতটা ফটোজেনিক। উন্নয়ন পরিকল্পনার জায়গায় আসে স্লো-মোশন হাঁটা, পেছনে দেশাত্মবোধক গান, সামনে আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টি। ভোট চাইতে এসে কেউ কেউ যেন বিজ্ঞাপনের মডেল হয়ে যাচ্ছেন—পণ্যটি কী? তা অবশ্য স্পষ্ট নয়।
প্রচারকর্মীদের কাণ্ড তো আলাদা অধ্যায়। তারা প্রার্থীর চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন কিভাবে ভাইরাল হওয়া যায়। কোন পোস্টে কম লাইক পেলেই সঙ্গে সঙ্গে জরুরি বৈঠক—"লিডার আজকে রিলটা চলেনি, কাল নাচের একটা দেই?"। নীতিগত বক্তব্যের বদলে প্রস্তাব আস—হালকা রম্য হলে শেয়ার বাড়বে।
এ অবস্থায় ভোটাররা দাঁড়িয়ে আছেন দ্বিধায়—ভোট দেবেন প্রার্থীকে, না তার ভিডিও এডিটরকে? হয়তো ভবিষ্যতে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হবে নতুন শর্ত: কমপক্ষে তিনটি ভাইরাল পোস্টের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
তবু ব্যঙ্গর আড়ালেও প্রশ্ন থেকে যায়—নির্বাচন কি সত্যিই জনসেবার প্রতিযোগিতা, নাকি এখন তা হয়ে উঠছে লাইকের লড়াই? যদি দৃষ্টি আকর্ষণই সব হয়, তবে ভোটের আবেদন হয়তো একদিন শুধু ক্যাপশনের শেষ লাইনে ছোট করে লেখা থাকবে—"ওহ হ্যাঁ, আমাকে ভোট দিতে ভুলবেন না কিন্তু"।
জাকির আহমদ খান কামাল
প্রধান শিক্ষক (অবঃ) ও কলাম লেখক
মোবাইল :০১৭১২৮৭৬৪৩৪



 (1)_medium_1760775829.jpg)
