নির্বাচনী প্রতীক; ডিজিটাল যুগে এনালগ ছাপ, জরুরী সংস্কার প্রয়োজন
মো: জায়েজুল ইসলাম
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:৪৯ বিকাল
তফসিল ঘোষনার মধ্যে দিয়ে সারাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। প্রার্থী মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও বৈধতা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাগণ। তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ২০ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহার ও ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে।
স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত নির্বাচনী প্রতীক একটি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। জাতীয় নির্বাচনে প্রধান প্রধান দলগুলোর নির্বাচনী প্রতীকগুলো বহুল পরিচিত হলেও অধিকাংশ দলের প্রতীকগুলো তেমনভাবে পরিচিত না। যেকোন ব্যক্তি বা দলের জয়-পরাজয়ে প্রতীক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর সে জন্যই হয়তো সামনের নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে জোটের প্রার্থী হয়েও নিজদলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন না করে জোটের বড়দলের প্রতীক নিয়ে নিবার্চন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অনেকেই।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের জন্য ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন ১১৯টি প্রতীক নমুনা হিসেবে প্রকাশ করছে। প্রকাশিত প্রতীকের মধ্যে কিছু কিছু প্রতীকের ছাপ এতটাই অস্পষ্ট যে, বুঝে নিতে অনেকটাই কষ্ট হয়। বর্তমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটের সাথেও অনেক প্রতীকের কোন মিল নেই। যেমন রেলইঞ্জিন প্রতীক হিসেবে পুরুনো আমলের কয়লার ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের ভোটাররা অনেকেই এই কয়লার ইঞ্জিন সম্পর্কে অবগত নন। থালা নামে একটি প্রতীক আছে যেটা দেখলে উপায় নেই যে এটা থালা না একটি কালো বৃত্ত। সকল প্রকার প্রতীকেই আধুনিক ডিজিটাল গ্রাফিক্স ব্যবহার না করে পুরোনো আমলের কাঠের ব্লকের ছাপের ছবি ব্যবহার করায় প্রতীকগুলো চিনতে কষ্ট হয়।
অনেক প্রতীকই বাস্তবতার সাথে মিল খুব একটা দেখা যায় না। যেমন কম্পিউটার, হেলিকপ্টার, কাঁঠাল, ফুলকপি, সেলাই মেশিন, ময়ুর, সিড়ি, রকেট, ফলের ঝুড়ি, কলার ছড়ি, মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন, হাতুরী ইত্যাদি। জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী কম থাকায় এ সব প্রতীক নিয়ে জঠিলতা কম হলেও স্থানীয় নির্বাচনে এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এক্ষেত্রে প্রতীক নিয়ে কাড়াকাড়ির এক পর্যায়ে লটারীর মাধ্যমে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর প্রতীকের অস্পষ্টতা ও অসামঞ্জস্যতার কারনে স্থানীয় নির্বাচনে ভোটের একটি বড় অংশ বাতিল হিসেবে গণ্য হয়। এই কারনের অনেক প্রার্থীর ফলাফলেও প্রভাব পড়ে। অনেকেই জয় থেকে বঞ্চিত হন।
এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য স্থানীয় নির্বাচন থেকে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত ব্যালট পেপারসহ অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে সরবরাহকৃত প্রতীকগুলো সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকরন করা জরুরী হয়ে পড়ছে। বর্তমানে প্রচলিত প্রতীকগুলো বহু আগের কাঠের ব্লক দিয়ে বানানো ছাপ দেওয়া ছবি। যার জন্য অনেক প্রতীক চিনতে কষ্ট হয়। পুরোনো আমলে কম্পিউটার প্রযুক্তি না থাকায়, কাঠের ব্লকে খোদাই করে বিশেষ পদ্ধতিতে ছবি ছাপানো হতো। আর মানুষ তাতেই অভ্যস্থ ছিল। কিন্তু বর্তমানে কম্পিউটার গ্রাফিক্স ব্যবহার করে প্রিন্ট করা এ সকল প্রতীক অনেকটা বাস্তব সম্মত ও নান্দনিক। যা নতুন প্রজন্মের ভোটারসহ শিক্ষিত, অশিক্ষিত, বয়স্ক সবার চিনতে সহজ হয়। আবার কিছু প্রতীক আছে যেগুলো বাস্তবে একটা আর একটার পরিপুরক। যেমন উড়োজাহাজ, হেলিকপ্টার। আবার দালানের ছবি দেখতে অনেকটা দোতলা বাসের মতই দেখা যায় । এ সকল ছবির মধ্যে আধুনিক গ্রাফিক্স ডিজাইন ব্যবহার করা হলে মানুষ সহজেই চিনতে এবং পার্থক্য করতে পারবে।
স্বাধীনতার পর দেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ। এর পর থেকে সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রতিনিয়ত বাড়ছে নিবন্ধিত দলের সংখ্যা। আর এসব নতুন দলের প্রতীক নির্বাচন নিয়েও চলছে কাড়াকাড়ি। সর্বশেষ এনসিপি’র প্রতীক নির্ধারন এর প্রকৃত উদাহরন। তাই নি:স্বন্দেহে বলা যায় একটি সুন্দর প্রতীক সবার পছন্দনীয়। আর এই প্রতীক যদি প্রিন্টের কারনে অসুন্দর ও অসামঞ্জস্য দেখায় বাস্তবের সাথে মেলাতে কষ্ট হয় তাহলে সেটা কাম্য নয়। তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বর্তমানে অনেক কিছুই সংস্কারের দাবী উঠছে। সেসব সংস্কারের সাথে স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে সরবরাহকৃত প্রতীকগুলো সংস্কার অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়ছে। প্রতীকগুলো দক্ষ গ্রাফিক্স ডিজাইনারের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত করে প্রিন্ট দিয়ে সরবরাহ করা এখন সময়ের দাবী। যাতে করে মানুষ সহজেই চিনতে পারে।
আগামী ২১ জানুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্ধের পরে ব্যালট পেপার ছাপানো ও সরবরাহ করা শুরু হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এনালগ প্রতীক থেকে আধুনিক গ্রাফিক্স ডিজাইন এর ছোঁয়ায় মুদ্রিত স্পষ্ট ঝকঝকে প্রতীকে ব্যালট পেপার চায় দেশবাসী। এর মাধ্যমে সকল নির্বাচনে অবসান হবে প্রতীকের অস্পষ্টতার অভিযোগ, কমবে বাতিল ভোটের সংখ্যা।



 (1)_medium_1760775829.jpg)

