সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২
শিরোনাম

প্রাথমিক শিক্ষায় বিদায় সংবর্ধনা কি বিদায়ের নামে তৈলমর্দনা?


  জাকির আহমদ খান কামাল

প্রকাশ :  ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৬:১০ বিকাল

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক বিদায় অনুষ্ঠানটি প্রাথমিক শিক্ষার অঙ্গনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিদায় অনুষ্ঠান নিঃসন্দেহে একটি সম্মানজনক ও মানবিক প্রথা। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে একজন শিক্ষক বা কর্মকর্তা যখন অবসরে যান, তখন তাঁর অবদান স্মরণ করা একটি সুস্থ সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু একই সঙ্গে এই ধরনের আয়োজনের ধরন, সময় ও প্রেক্ষাপটও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রাথমিক শিক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে বহু শিক্ষক নীরবে অবসরে গেছেন। তাঁদের অনেকেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে জীবনভর দায়িত্ব পালন করেছেন, শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন, কিন্তু বিদায়ের মুহূর্তে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি। এই বাস্তবতার আলোকে হঠাৎ করে একটি আড়ম্বরপূর্ণ বিদায় আয়োজন স্বাভাবিকভাবেই বৈষম্যের প্রশ্ন তোলে।

সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা বহু প্রতীক্ষিত দশম গ্রেড অর্জন করেছেন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও সংগ্রামের ফল। এই অর্জন প্রাথমিক শিক্ষার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই সম্মিলিত সাফল্যকে কেন্দ্র করে তেমন কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা সম্মানসূচক আয়োজন দেখা যায়নি। ফলে শিক্ষক সমাজের একটি বড় অংশের মনে অভিমান ও হতাশা জমে ওঠাই স্বাভাবিক।

বিদায় অনুষ্ঠানে লক্ষ্য করা গেছে—আয়োজন ছিল জাঁকজমকপূর্ণ, বক্তব্য ছিল প্রশংসায় পরিপূর্ণ। তবে সেখানে শিক্ষক সমাজের সার্বিক প্রতিনিধিত্ব কতটা ছিল, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেকের কাছে শিক্ষকশূন্য চেয়ার ও সীমিত উপস্থিতি একটি নীরব বার্তা বহন করেছে। এটি হয়তো আয়োজনের উদ্দেশ্য ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করে।

এখানে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন—বিদায়ী দুইজন সম্মানিত শিক্ষাবিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান অক্ষুণ্ন। তাঁদের কর্মজীবনের অবদান প্রাথমিক শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যক্তিগত সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি সামগ্রিক শিক্ষক সমাজের অনুভূতি ও বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়াও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচায়ক।

প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা আজ নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—পদোন্নতি, মর্যাদা, ন্যায্য স্বীকৃতি ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষকদের ভেতরে জমে আছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। এই বাস্তবতায় কোনো আয়োজন যদি ঐক্য সৃষ্টি করার বদলে বিভক্তির অনুভূতি বাড়ায়, তবে সেটি আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।

শিক্ষক সমাজের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়—সমতা, সম্মান ও স্বচ্ছতা। বিদায় হোক বা সংবর্ধনা—সব আয়োজনেই যদি এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা যায়, তবেই প্রাথমিক শিক্ষায় প্রকৃত সৌহার্দ্য ও আস্থা ফিরে আসবে। অন্যথায়, আড়ম্বর যত বাড়বে, প্রশ্নও ততই জোরালো হবে।

জাকির আহমদ খান কামাল 
প্রধান শিক্ষক (অবঃ) ও কলাম লেখক 
মোবাইল :-০১৭১২৮৭৬৪৩৪

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত