সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ৫ মাঘ ১৪৩২
শিরোনাম

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ডান, বাম, মধ্যপন্থার রাজনৈতিক প্রভাব ও নির্বাচনী ইশতেহার


  জাকির আহমদ খান কামাল

প্রকাশ :  ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:১৯ দুপুর

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডান পন্থী, বাম পন্থী ও মধ্য পন্থী—এই তিন ধারার কথা প্রায়ই উচ্চারিত হলেও বাস্তবে কোনো দলই খাঁটি আদর্শের পথে চলে না। বিশেষ করে শিক্ষা খাতে এই আদর্শগত মিশ্রণ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। রাষ্ট্রের নীতি, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তব প্রয়োগের ফারাক এখানেই ধরা পড়ে।

বাম পন্থী রাজনীতির দর্শন অনুযায়ী শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। বাংলাদেশের সংবিধানও সেই অঙ্গীকার বহন করে। প্রাথমিক স্তরে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি কর্মসূচি, বিদ্যালয়ভিত্তিক মিড-ডে মিল এবং সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ—এসবই বামমুখী রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। একইভাবে সরকারি শিক্ষকদের বেতন কাঠামো, চাকরির নিরাপত্তা ও কেন্দ্রীয় নিয়োগব্যবস্থা রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার উদাহরণ। তবে বাস্তবে শ্রেণিকক্ষের সংকট, শিক্ষক স্বল্পতা ও মানোন্নয়নের দুর্বলতায় এই দর্শন অনেক সময় কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।

অন্যদিকে ডান পন্থী রাজনীতির প্রভাবও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্রমশ জোরালো হয়েছে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের বিস্তার, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও কোচিংনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা মূলত বাজারমুখী দর্শনের ফল। শিক্ষা এখানে সামাজিক সেবা নয়, বরং বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। উচ্চশিক্ষায় ব্যয়বহুল ফি, গ্রাম-শহরের মানগত বৈষম্য এবং শিক্ষাকে পণ্য বানানোর অভিযোগ এই ধারার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সমালোচনা। তবুও রাষ্ট্র এই ব্যবস্থাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।

এই দুই বিপরীত ধারার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বাস্তব মধ্যপন্থী শিক্ষা নীতি। এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা তার বড় উদাহরণ। এখানে রাষ্ট্র বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে অর্থায়ন করে, কিন্তু পূর্ণ দায় নেয় না। একইভাবে জাতীয় কারিকুলাম অনুসরণ করেও বেসরকারি স্কুল-কলেজ পরিচালনা, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ—সবই সমন্বয়বাদী নীতির প্রতিফলন। তবে এই মধ্যপন্থা অনেক সময় দ্ব্যর্থহীন নীতির অভাবে শিক্ষকদের বৈষম্য ও প্রশাসনিক জটিলতা বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় শিক্ষা নীতি আদর্শনির্ভর কম, বরং পরিস্থিতিনির্ভর বেশি। ক্ষমতায় গেলে ডান-বাম বিভাজন ঝাপসা হয়ে যায়; টিকে থাকে জনপ্রিয়তা ও ভোটের হিসাব। ফলে শিক্ষা সংস্কার হয় খণ্ডিত, দীর্ঘমেয়াদি নয়।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট, মানবিক ও বৈষম্যহীন শিক্ষা দর্শন—যা দলীয় সীমারেখা অতিক্রম করে জাতীয় ঐকমত্যে রূপ নেবে।

নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে থাকে সড়ক, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান ও ভর্তুকির প্রতিশ্রুতি। কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার—শিক্ষা—প্রায়ই থাকে সাধারণ কিছু কথায় সীমাবদ্ধ। বর্তমান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে শিক্ষা নিয়ে সুস্পষ্ট, বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী এজেন্ডা থাকা এখন রাজনৈতিক দলের জন্য অনিবার্য।

টেকসই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া অতীব জরুরী। শিক্ষক নিয়োগ, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন কিংবা প্রশাসনে দলীয়করণ শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে। শিক্ষা খাতকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করাই উচিত শিক্ষাবান্ধব রাজনৈতিক দলের। নির্বাচন আসে-যায়, কিন্তু শিক্ষায় সিদ্ধান্তের প্রভাব থাকে না প্রজন্মজুড়ে। তাই শিক্ষা নিয়ে আর দায়সারা স্লোগান নয়, চাই সুস্পষ্ট এজেন্ডা ও বাস্তব অঙ্গীকার—যার ওপর দাঁড়িয়ে জাতির সুদৃঢ়  ভবিষ্যৎ নির্মিত হবে।

জাকির আহমদ খান কামাল 
প্রধান শিক্ষক (অবঃ) ও কলাম লেখক 
মোবাইল :-০১৭১২৮৭৬৪৩৪

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত