শেরপুরে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে শত শত মানুষ
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৬ দুপুর

শেরপুরে দিন দিন বাড়ছে অজ্ঞান পার্টি তৎপরতা। এতে অসংখ্য নিরীহ মানুষ এবং ব্যবসায়ীরা হারাচ্ছে তার ব্যবসার টাকা। শুধু তাই নয় অজ্ঞান পার্টির ব্যবহার করা মেডিসিনে অনেকেই মানসিকভাবে বিকার হয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ গত এক সপ্তাহে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারিয়েছে তিন ব্যবসায়ী। চলতি বছরের নয় মাসে জেলায় প্রায় দুই শতাধিক মানুষ এই অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
শেরপুরে মানবিক সাহায্য সহযোগিতা ও স্বেচ্ছাশ্রমে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো সংগঠন ‘আজকের তারুণ্য’ এর দেয়া তথ্যসূত্রে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে নিজস্ব হওয়া মানুষ এবং অসুস্থ হওয়া মানুষ থানা পুলিশকে অবগত না করার কারণে পুলিশের হাতেও এসব বিষয়ে কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
আজকের তারুণ্য’র দেয়া তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, তারা দীর্ঘদিন থেকেই রাস্তায় পড়ে থাকা অসুস্থ এবং দুর্ঘটনার শিকার আহত মানুষ, হারিয়ে যাওয়া বয়োবৃদ্ধ ও শিশু-নারীকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে প্রাথমিকভাবে সদর হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা সেবা দেয়। পরবর্তীতে অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার পর তার স্বজনদের খোঁজখবর নিয়ে তাদের হাতে তুলে দেন।
এছাড়াও তারা অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ সৎকারে কাজ করার পাশাপাশি অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় জানার জন্য তাদের নিজস্ব ফেইসবুক পেইজে পোস্ট করে থাকেন। পরবর্তীতে ওই অজ্ঞাত ব্যক্তির পরিচয় সন্ধান মিললে তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেয়া হয়।
আজকের তারুণ্যের এইসব কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়া অসুস্থ মানুষকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা । এরপর দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত তারা অজ্ঞান অবস্থায় থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে। এই সময়ের মধ্যে তারা ওই ব্যক্তির ছবি তুলে তাদের নিজস্ব ফেইসবুক পেইজে প্রচার করেন তার স্বজনের সন্ধানের জন্য। এক পর্যায়ে অজ্ঞান ব্যক্তি সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তার নিজের অবস্থান জেনে স্বজনদের খবর দিয়ে তাদের সাথে বাড়ি ফিরে যায়।
ইতিমধ্যে গত নয় মাসে তারা প্রায় দুই শতাধিক অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়া অসুস্থ মানুষের সুস্থ করে তাদের নিজ নিজ পরিবারে ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে দাবি করেছে আজকের তারুণ্যের প্রতিষ্ঠাতা রবিউল ইসলাম রতন।
তাদের সূত্র মতে, সর্বশেষ গত এক সপ্তাহে তিন জন ব্যক্তিকে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে অজ্ঞান অবস্থায় তুলে এনে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে স্বজনের খোঁজ নিয়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছে। এসব অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়া মানুষগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা টার্গেটকৃত মানুষকে নানা কৌশলে মেডিসিনের মাধ্যমে অজ্ঞান করে সর্বস্ব লুটে নেয়। এরপর তাদেরকে ঢাকা-ময়মনসিংহ-শেরপুর বাসে তুলে দেওয়া হলে শেরপুরে এসে ওইসব বাসের হেলপার তাদেরকে রাস্তায় ফেলে রেখে যায়।
এদের মধ্যে জয়পুরহাট জেলার আলু ব্যবসায়ী সাইদুর মিয়া (৫০)। তিনি গত ২৫ সেপ্টেম্বর আলু বিক্রির উদ্দেশ্যে জয়পুরহাট থেকে ঢাকার পথে রওনা হন। তাঁর সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ছিল। পথিমধ্যে এক ব্যক্তি তাঁকে পাউরুটি খেতে দিলে তা খাওয়ার পর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তাঁকে শেরপুর নিউমার্কেট এলাকায় পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় ঢাকায় ওই অজ্ঞান পার্টি তাকে অজ্ঞান করে সর্বস্ব নিয়ে শেরপুরের বাসে তুলে দেয়। পরবর্তীতে ওই বাসের হেলপার ভোর বেলা শহরের নিউমার্কেট মোড়ে ফেলে রেখে দেয়।
এদিকে বিষয়টি জানতে পেরে আজকের তারুণ্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন-এর সদস্যরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁকে উদ্ধার করে শেরপুর জেলা হাসপাতালে ভর্তি করেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি প্রকাশ করে পরিবারের সন্ধান চাওয়া হল ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁর পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায় এবং তাকে শেরপুর থেকে নিয়ে যায়।
এরপর ১ অক্টোবর সাইদুল (৬০) নামে এক বৃদ্ধ শহরের নবীনগর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে আজকের তারুণ্যের সদস্যরা । পরবর্তীতে তিনি সুস্থ হলে তার পরিচয় পাওয়া যায় তার গ্রামের বাড়ি শেরপুর সদর উপজেলার গাজীর খামার গ্রামে।
সুস্থ হয়ে সাইদুর জানায়, ১ অক্টোবর ঢাকা থেকে শেরপুরগামী গাড়িতে আসার পথে এক ব্যক্তি তাঁর নাকের কাছে কিছু ধরার পর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন এবং এরপর আর কিছু বলতে পারেনি। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ছবি প্রকাশ করে পরিবারের সন্ধান চাওয়া হলে ৩ অক্টোবর তাঁর পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়।
গত ২ অক্টোবর ময়মনসিংহ শহরের চৌরাস্তা এলাকার বাসিন্দা অটো ব্যবসায়ী আজিম উদ্দিন (৫৫) এক লক্ষ টাকা নিয়ে অটো কেনার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হওয়ার পর ময়মনসিংহ শহরে এক ব্যক্তি তাঁর নাকের সামনে কিছু ধরলে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তাঁকে শেরপুরের নবীনগর কবরস্থানের পাশে পাওয়া যায়।
এরপর আজকের তারুণ্য এর সদস্যরা স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে ৩ অক্টোবর তাঁর পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায় এবং তাকে শেরপুর থেকে নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে আজকের তারুণ্যের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রবিউল ইসলাম রতন বলেন, আমার প্রধানত মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ বিতরণ, অসহায়, দরিদ্র ও দুস্থ পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং রোগীর চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা করা, হারিয়ে যাওয়া ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, হারিয়ে যাওয়া শিশু ও ব্যক্তির পরিবার খুঁজে পেতে সহায়তা, পরিচয়হীন অসুস্থ ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের বিগত নয় মাসে আমরা প্রায় দুই শতাধিক অজ্ঞান পার্টির খবর মানুষকে উদ্ধার করে সুস্থ করে করে তাদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।
তবে এসব বিষয়ে সরকারি কোন সহযোগিতা না পেলেও আমরা নিজেরাই এসব কাজ করছি। সরকারিভাবে সুবিধা পেলে আমাদের কাজের গতি আরো বাড়বে।
এ বিষয়ে পুলিশ সুপার মোঃ জহিরুল ইসলাম বলেন, আজকের তারুণ্যের কার্যক্রমের বিষয়টি আমার জানা নেই। এছাড়া যেহেতু উল্লেখিত ঘটনা গুলোর বিষয়ে স্থানীয় থানা পুলিশেরকে ইনফর্ম করা হয় না বিধায় এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না। তবে আজকের তারুণ্যের সংগঠনের তথ্যগত ভুল থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করেন।







