মাজেদুল হকের কবিতায় বিরহের কারুকার্য
আরবান ডেস্ক
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৬ দুপুর

বিরহী কবি উপাধিতে ভূষিত, সমধিক খ্যাত ও সমাদৃত ছান্দসিক রীতির সুপরিচিত কবি মাজেদুল হক সৃজনশীল প্রজন্মের ধ্রুপদী কবি।
প্রথাগত ছন্দে তিনি দেখিয়েছেন মুন্সিয়ানা, সৃষ্টি করেছেন নবছন্দরীতি বা ছন্দ কাঠামো। লিখেছেন নিজস্ব ছন্দরীতিতে কবিতা।
কলম একাডেমি লন্ডন ও কলম টিভির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক নজরুল ইসলাম হাবিবী ২০২২ খ্রিস্টাব্দে একাডেমির পক্ষ থেকে কবি মাজেদুল হককে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ, তাঁর সাহিত্যচিন্তার আলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘বিরহী কবি’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
প্রকৃতপক্ষে বিরহী কবি মাজেদুল হক সৃজনশীল প্রজন্মের একজন ধ্রুপদী কবি, তাঁর কাব্যিক শৈলী অনন্য।
কবি মাজেদুল হক বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলার সদর উপজেলার পাটলী গ্রামে সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা—এস এম কিতাব আলী, মাতা—বেগম আয়েশা খাতুন।
কিশোর বয়স থেকে কবির লেখালেখির হাতেখড়ি। বি.এ. অধ্যয়নরত সময়ে তাঁর লেখা প্রথম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং এখনও নিয়মিত স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে বিরহী কবির লেখা।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কর্মরত কবির কর্মব্যস্ত জীবন। তারপরেও সময়-সুযোগে চালিয়ে যাচ্ছেন কবির সৃজনশীল লেখনী।
২০১৭ খ্রিস্টাব্দে মুক্তির আশা ও নেত্রের আশা পত্রিকার যৌথ উদ্যোগে ছড়া প্রতিযোগিতায় সেরা ছড়াকার নির্বাচিত হওয়ায় নেত্রকোণা জেলা প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত জনসমাবেশে তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক ডক্টর মুশফিকুর রহমান কবির হাতে সম্মাননা স্মারক (সেরা ছড়াকার সম্মাননা) তুলে দেন এবং দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক অধ্যাপক যতীন সরকার কবিকে ‘উত্তরীয়’ পরিয়ে সম্মানিত করেন।
২০২৪ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য হাজার কবির কবিতা সাহিত্য পরিষদের পক্ষ থেকে বিরহী কবিকে ‘জহিরুল সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান করেন।
কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে কবি মাজেদুল হক ‘কবিতা’ শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন—
কবিতা
ক - বি - তা - ;
কবি বিবেক তাপস,
জীবন প্রেম যশ।
কবি,
ক - বি - ;
কথা বিশ্লেষক,
শব্দের অন্বেষক।
বিবেক,
বি - বে - ক - ;
বিষয় বেষ্টিত করণ,
বাক্যে ছন্দের প্রকরণ।
তাপস,
তা - প - স - ;
তালাস পণ্ডিত সঞ্চয়,
বিচিত্র জ্ঞানের সমন্বয়।
কৈশোরে যখন প্রেম আসে কবির জীবনে, কবি ‘প্রেম’ শিরোনামের কবিতায় লিখেন তাঁর সরল মনের কাব্যিক বাণী—
প্রেম
শুনেছি লোকের মুখে
প্রেম করে সাধু,
মনের প্রকৃত আকর্ষণ
নয় কোনো যাদু।
জেনেছি জ্ঞানীর কাছে
খাঁটি প্রেম করিলে,
সুখের অমৃত স্বাদ
প্রেমিকের ভাগ্যে মিলে।
দেখেছি জগতের মাঝে
সত্যিকার প্রেমিক যাঁরা,
মরিতে বাধ্য তবুও
প্রেম ভুলে না তাঁরা।
বুঝেছি প্রেম আসলেই
স্রষ্টার অতুলনীয় দান,
তাই একজনের প্রতি
আরেক জনের আত্মার টান।
হঠাৎ যখন সামাজিক ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙে দেয় কবির প্রীতির বন্ধন, প্রিয়া হারানোর বিরহব্যথায় ব্যথিত বিরহী কবি ‘অপহরণ’ শিরোনামের কবিতায় লিখেন—
অপহরণ
মনের মিলন ছিল দু'জনের মাঝে,
মিলেমিশে চলিতাম খেলাধুলা কাজে ;
আমায় দেখিতো যদি,
বলিত দরদী-
তোমায় দেখিলে আমি আনন্দে বিভোর,
মনের গহীনে বাঁশি বাজে সুমধুর ।
হাসি মুখে কাছে এসে দু'হাত বাড়িয়ে,
বুকের সাথে আমায় ধরিতো জড়িয়ে ;
বিনয় করি তোমায়
ভুলো না আমায়-
তোমাকে না পেলে আমি কিন্তু মরে যাবো,
জানি না আমায় নিয়ে তুমি কিযে ভাবো।
তাহার মাথায় রেখে আমার দু'হাত,
কসম দিয়েছে মোরে থাকিতে হায়াত ;
হয়তো ঝড় উঠিবে
কত কি বলিবে-
ছাড়িয়া যাবে না মোরে দু'টি পায়ে ধরি,
তোমার জীবন সাথী হয়ে যেন মরি।
গোপনে অভিভাবক শাসন করিল,
ষড়যন্ত্র করে তাকে নির্বাসন দিল ;
শুনিয়া বিবেকে বাঁধে
এখনো সে কাঁদে-
অধ্যয়নরত আমি তখন ছিলাম,
পরিস্থিতির কারণে কষ্টই পেলাম।
বিধির কী যে বিধান পারি না বুঝিতে,
প্রিয়জন কেড়ে নিলো কঠোর নীতিতে ;
ব্যথার দু'টি পাহাড়
শুধু হাহাকার-
সে কাঁদে আমিও কাঁদি ব্যথিত দু'জন,
বিয়ের নামে হয়েছে সে অপহরণ।
জোরপূর্বক অন্যত্র বিয়ে দেওয়ার পরেও যেহেতু কবির প্রিয়া কবির জন্যে কাঁদে, তখন বিরহী কবি নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে, ‘ব্যর্থতা’ শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন—
ব্যর্থতা
সবিনয়ে তুমি সামনে দাঁড়িয়ে,
যুগল আঁখির দৃষ্টি বাড়িয়ে ;
প্রস্তাব দিলে,
ক্ষতি কি তোমার সাথী করে দিলে ?
নিরুপায় আমি উত্তর দিতে,
আশায় ছিলাম সাথী করে নিতে ;
ভয় ছিল তবু,
শপথ রাখিতে না পারিলে কভু।
দিবানিশি তুমি প্রহর গুনিতে,
কি জবাব দেব নীরবে শুনিতে ;
ফেলে আঁখিজল,
সময় সুযোগে বলিতে সকল।
ভরসা ছিল না এতটুকু মনে,
সুদিন আসিবে আলোকিত ক্ষণে ;
বেকার ছিলাম,
প্রেমকে জ্যান্ত করব দিলাম।
চাকুরিটা পেয়ে আসিলাম ছুটে,
কে যেন তোমায় নিয়ে গেল লুটে ;
বড়লোক স্বামী,
এখন সমাজে লুটেরাই দামী।
ব্যর্থতা এটা বলিনি ভাষায়,
কিছুদিন তুমি থাকিও আশায় ;
লুকোচুরি খেলা,
না পেয়ে আমায় তুমি চলে গেলা।
পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যখন জোরপূর্বক কবির প্রিয়াকে অন্যের ঘরে দেওয়া হয়, তখন বান্ধবীরা কবিকে শান্তনা দিতে গিয়ে কবির হৃদয়ে ঠাঁই নিতে প্রচেষ্টা চালায়। এমন প্রস্তাব কবি প্রত্যাখ্যান করিতে কাব্যিক ভাষায় বোঝালেন—
তোমাদের পাশে প্রতিদিন এসে
আর কিছু বলব না,
যদিও দেখা হয় সময় থাকবে স্বল্পময়
হৃদয়ের ভাষা বুঝাতে পারব না।
কবি যখন প্রিয়া হারিয়ে একাকীত্ব জীবন, তখন কবির বন্ধুরা মিলে কবির খোঁজখবর নিতে ব্যস্ত। অনেকেই জিজ্ঞেস করে মনের অবস্থা জানতে চাইলে, কবি বলেন—
বিরহ আমার পুঁজি,
সুখের ঠিকানা খুঁজি।
বিরহী কবির ছান্দসিক পঙ্ক্তি বন্ধুদের মুখে মুখে রটে যায় চতুর্দিকে।
ভালোবাসার বন্ধন বিচ্ছিন্ন হওয়ার দীর্ঘদিন পরে যখন হঠাৎ সাক্ষাৎ হয়ে যায় দুজনের, তখন সেই মুহূর্তের মনোভাব উপলব্ধি করে বিরহী কবি ‘সাক্ষাৎ’ শিরোনামের কবিতায় লিখেছেন—
সাক্ষাৎ
পথিক তুমি কে ?
এভাবে চাহিলে যে আমার দিকে !
পরিচয় দাও চেনা প্রয়োজন,
দেখে মনে হয় শত বছরের পরিচিত প্রিয়জন।
মুখ তুলে চাও,
কি বলিবে তুমি সোজা বলে যাও ;
অতীতে ছিল কি কোন লেনাদেনা ?
চোখে চোখ রেখে বলো অভিমান করে কিছু লুকাবে না।
মুখোশ খুলিয়া,
অবুঝের মতো নীরবে কাঁদিয়া ;
বলিতে লাগিল ছিল যত মনে,
তুমি ভুলে গেছো আমিতো পারিনা নিত্য ভাসে নয়নে।
মুখ দেখে বুঝি,
বহুদিন পরে সে পেয়েছে খুঁজি ;
উভয়ের মনে শুধু হাহাকার,
দু'চোখের জল মুছাবার মতো নেই আজ অধিকার।
ইশারা করিছে,
চলে যেতে হবে লোকটি আসিছে ;
বুঝেছি লোকটি তাহার এখন,
ধর্মের নীতি সংসার প্রীতি সবটুকু প্রয়োজন।
থাকিতে হায়াৎ ,
কভু দু'জনে কি হবে সাক্ষাৎ ?
নিয়ে গেল তাঁকে নিদয়ার মত,
সে তাকায় ফিরে তাই চেয়ে থাকি হৃদয়ে রয়েছে ক্ষত।
বিরহী কবির বিরহীনি প্রেমিকা কবির পথপানে চেয়ে কবির অপেক্ষায় প্রহর গুনিতে গুনিতে অস্থির হয়ে যেত। প্রিয়ার সেই অবস্থা নিয়ে ‘অপেক্ষা’ শিরোনামের কবিতায় কবি লিখেছেন—
অপেক্ষা
কথা ছিল তুমি আসবে
আশায় রয়েছি আজও পথ চেয়ে-
একাকী জীবন কত কষ্টের
তুমি কি একটু বুঝও ?
মাঝরাতে হঠাৎ শুনি তোমার কন্ঠ-
দরজায় কড়া নেড়ে ডাকছো আমায়
এই , শুনছো ?
দরজা খোলো, কী হলো ?
দরজা খোলও !
শিশুর মতো চমকে উঠি
দুচোখ কচলাতে কচলাতে
বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলি
চেয়ে দেখি তুমি নেই !
দিবালোকে জালার পাশে দাঁড়াই
চেয়ে থাকি সুদূর পথে-
হঠাৎ দেখি তুমি আসছো !
এক লাফে চৌকাঠ পেড়িয়ে
দাঁড়াই বাড়ির সামনে
কাছে এলে দেখি, তুমি না !
তোমার মতো অন্য কউ
এখন তোমায় খুঁজে অস্থির !
অপেক্ষায় প্রতিটি প্রহর যেন হাজার বছর !
পরের ঘরে দিনযাপন করেও যখন কবির প্রিয়া কবিকে নিয়ে এবং কবির দেওয়া উপহার নিয়ে স্মৃতিচারণ করে, সেই মানসী প্রিয়ার স্মৃতিচারণ নিয়ে ‘নাকফুল’ শিরোনামের কবিতায় কবি লিখেছেন—
নাকফুল
আয়নায় মুখ দেখি যতবার নাকফুল চোখে পরে,
নাকফুলে তাঁর ঝলমলে মুখ চাঁদের আলোয় ভরে।
এই সেই স্মৃতি অমর কীর্তি আধু ,
কেঁদে ওঠে মন কেউ করে নাই যাদু ।
ঐ নাকফুল তাহার দেওয়া উপহার প্রীতিময়,
হৃদয় গগণে আলোকিত চাঁদ অমলিন হয়ে রয়।
শিল্পীর আঁকা ক্যানভাসে সেই ছবি,
সেতো প্রাণপ্রিয় আমার বিরহী কবি।
কতকিছু কথা অন্তরে গাঁথা হয়তো জানে না কেউ,
অকুল সাগরে পদ্মের মতো অবিকল ভাসে ঢেউ ।
কৈশোরে ছিল দু'জনের মাঝে প্রীতি,
ভাগ্যের খেলা হয়েছে বিরহ গীতি।
ভালো থেকো আজি প্রার্থনা মোর জীবন হল নাটক,
এখনো তোমায় ভালোবাসি বলে হয়ে গেলাম পাঠক।
মনের শান্তি মিলেছে তোমার কাছে,
মনে হলে প্রাণ পাখি আনন্দে নাচে।
হাজার বছর সাধনা করেও মিলে না এমন সুখ,
আদর সোহাগে ভরে দিলে তুমি আমার কোমল বুক।
কবি মাজেদুল হকের কবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় বিরহের সুনিপুণ কারুকার্য। বাংলা সাহিত্যে তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং বিরহের নৈপুণ্যতায় অদ্বিতীয়।







