শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম

কারিগরি শিক্ষার অগ্রযাত্রা বনাম ট্রেড কোর্সের চোরাবালি: কোন পথে বাংলাদেশ?


  ইঞ্জিনিয়ার শাহীন সরদার

প্রকাশ :  ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৫:২২ বিকাল

​একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো দক্ষ মানবসম্পদ। আর এই মানবসম্পদ গড়ার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার কারিগরি শিক্ষা। বিশ্বায়নের এই যুগে যে দেশ কারিগরি শিক্ষায় যত বেশি উন্নত, তাদের অর্থনীতির ভিত ততটাই মজবুত। সিঙ্গাপুর, জাপান, দুবাই কিংবা মালয়েশিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতের হার প্রায় ৫০% থেকে ৮০% পর্যন্ত। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিপুল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন মানুষ কখনো বেকার থাকে না; সে নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করতে পারে।

​বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষার এই গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমান সরকার বিগত বছরগুলোতে নানামুখী প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ২০০৯ সালে যেখানে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর হার ছিল মাত্র ১%, সেখানে ২০১৫ সালে ১৫% এবং ২০২০ সালের মধ্যে তা ২০%-এ উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল শেখ হাসিনা সরকার। সরকারি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল পড়াশোনার অবারিত সুযোগ। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আজ অবধি আমরা শতভাগ মানসম্মত ২০% কারিগরি শিক্ষার হার নিশ্চিত করতে পারিনি।

​যখন আমাদের উচিত ছিল এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আরও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাক্রমকে আরও আধুনিক ও উচ্চতর কোর্সের সমন্বয়ে সমৃদ্ধ করা, ঠিক তখনই কারিগরি শিক্ষাকে এক আত্মঘাতী চোরাবালির দিকে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। সম্প্রতি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের একটি চিঠির মাধ্যমে জানা গেছেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসমূহের দ্বিতীয় শিফটের সক্ষমতা ব্যবহার করে সেখানে ২ বছর মেয়াদি সার্টিফিকেট বা ট্রেড ভিত্তিক কোর্স চালুর সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে একে অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার মনে হলেও, এটি মূলত দেশের চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার মান এবং মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার এক গভীর ষড়যন্ত্র।

​দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং ৪ বছরের কঠোর প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার মাধ্যমে আমাদের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা আজ সমাজের কর্মক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। তারা দেশের মধ্যম সারির ব্যবস্থাপক ও প্রকৌশলী হিসেবে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন। এখন পলিটেকনিকের মতো মধ্যম সারির প্রকৌশলী গড়ার মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলোকে 'ট্রেড প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে' রূপান্তর করার এই চেষ্টা দেশের ভবিষ্যৎ কারিগরি শিক্ষার গতিশীলতার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।

​আমাদের দেশে ট্রেড ভিত্তিক ও স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (TTC) বা টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (TSC)-এর মতো আলাদা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী তৈরি করা, কারিগর বা ট্রেড পারসন তৈরি করা নয়। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষার মানকে আরও উন্নত করার পরিবর্তে যদি এভাবে কাটছাঁট ও সংকোচনের নীতি গ্রহণ করা হয়, তবে তা দেশের কারিগরি শিক্ষার গুণগত মানকে ধ্বংস করে দেবে। শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য যেমন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার এবং মাঠপর্যায়ের ট্রেড ভিত্তিক দক্ষ কর্মী। প্রত্যেকের কাজের ক্ষেত্র এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা আলাদা। একটির ভেতর অন্যটি চাপিয়ে দিয়ে গুলিয়ে ফেলার এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।

​সরকারের উচিত এই হঠকারী ও ক্ষতিকর সিদ্ধান্তকে আমলে নিয়ে অবিলম্বে তা বাতিল করা। পলিটেকনিকের ঐতিহ্য ও শিক্ষার মান ধরে রাখতে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সকে আরও যুগোপযোগী করতে হবে, কোনোভাবেই একে খণ্ডিত বা ছোট করা যাবে না। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গতিশীলতা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাঁচানোর স্বার্থে আমরা এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করছি।

 

​​ইঞ্জিনিয়ার শাহীন সরদার
মেম্বার, আইডিইবি, এনটিবি কিউএফ (NTVQF), বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
সাধারণ সম্পাদক, আইডিইবি (IDEB) আইডিয়া।
সিইও, সানমার্ক মিডিয়া কমিউনিকেশন।
ফাউন্ডার জিএসএফ (GSF) ফাউন্ডেশন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত