বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম

`বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ' সফলতার জন্য কি ধরণের প্রস্তুতির প্রয়োজন


  আসাফ উদ্ দৌলা (আশেক)

প্রকাশ :  ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৫ রাত

সবুজ বাংলাদেশ গড়তে এখনই সম্মিলিত উদ্যোগের সময়

একটা গাছ কতটুকু জায়গা নেয়? কয়েক বর্গফুট মাটি, একটুখানি রোদ, আর কিছু বৃষ্টির পানি। অথচ বিনিময়ে সে যা ফিরিয়ে দেয় তা হচ্ছে— অক্সিজেন, ছায়া, বৃষ্টি, খাদ্য, জীবিকা, এমনকি একটা দেশের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই হিসাব কোনো ব্যালেন্স শিটে ধরা পড়ে না। আর ঠিক এই জায়গাতেই বাংলাদেশের মতো একটি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য বৃক্ষরোপণ আর নিছক একটি "ভালো কাজ" নয়, এটি এখন অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই আজকের ডাক একটাই— "বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।" এইটি এখন স্লোগান নয়, একটি জাতীয় অঙ্গীকার।

যে সংকট আমাদের চোখের সামনে

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বন উজাড়, নদী ও বায়ু দূষণ, সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি আর জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়—এসব আজ আর দূরের কোনো পরিসংখ্যান নয়, বাংলাদেশের প্রতিদিনের বাস্তবতা। ভৌগোলিক অবস্থান আর ঘনবসতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিটি আঘাত এখানে সরাসরি মানুষের জীবনে আঁছড়ে পড়ে। উপকূলে বাড়ছে লবণাক্ততা, ঘন ঘন হানা দিচ্ছে ঘূর্ণিঝড়, নদী গিলে খাচ্ছে ভিটেমাটি, আর দীর্ঘায়িত হচ্ছে অতি বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের মৌসুম। শহরেও স্বস্তি নেই। কংক্রিটের বিস্তার আর সবুজ কমে যাওয়ায় তৈরি হচ্ছে "নগর তাপদ্বীপ"—যেখানে তাপমাত্রা শুধু বাড়ছেই না, বাড়ছে বিদ্যুতের চাপ, স্বাস্থ্যঝুঁকি আর কর্মক্ষমতার ক্ষতিও।

এই সংকটের মুখে সবচেয়ে সহজ, সাশ্রয়ী আর কার্যকর অস্ত্র হলো বৃক্ষ। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ শুধু কার্বন শুষে অক্সিজেন দেয় না, সে বৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করে, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, ভূমিক্ষয় ঠেকায়, শব্দ ও ধুলো কমায়, এমনকি মানুষের মানসিক প্রশান্তিতেও ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানীরা বলেন, একটি বড় গাছের পরিবেশগত সেবার মূল্য তার কাঠের দামের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

সংখ্যায় বাংলাদেশের বন: বাস্তবতা কী বলে

আবেগের পাশাপাশি সংখ্যাটাও জানা দরকার। বাংলাদেশ বন বিভাগের জাতীয় বন জরিপ (BFI) বলছে, দেশের মোট ভৌগোলিক এলাকার প্রায় ১২.৮% বনাঞ্চল (শুধু স্থলভাগ ধরলে ১৪.১%), যেখানে শনাক্ত হয়েছে ৩৯০টি বৃক্ষপ্রজাতি। ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে বৃক্ষ আচ্ছাদন কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু শালবন আর পার্বত্য বনাঞ্চলে তা কমেছে। সংখ্যাটা আরও স্পস্ট করে তুললে দেখা যায়—দেশের প্রায় ৬৪% মানুষ কোনো না কোনোভাবে বন ও বৃক্ষসম্পদের ওপর নির্ভরশীল, আর সুন্দরবন-সংলগ্ন জনগোষ্ঠীর বার্ষিক আয়ের প্রায় ৯% আসে বনসম্পদ থেকেই। অর্থাৎ বন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়—এটি গ্রামীণ অর্থনীতি আর খাদ্য নিরাপত্তারও ভিত্তি।

সরকারও বিষয়টি অগ্রাধিকারে রেখেছে। জাতীয় বননীতি ২০১৬, বাংলাদেশ ফরেস্ট্রি মাস্টার প্ল্যান (২০১৬–২০৩৬) এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ২৪% এলাকা বৃক্ষ আচ্ছাদনের আওতায় আনার লক্ষ্য ঠিক হয়েছিল, সঙ্গে ম্যানগ্রোভ ও সামাজিক বনায়নের মতো কর্মসূচিও। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এটিকে ইতিবাচক বললেও একটি শর্তে জোর দিচ্ছেন বারবার—দেশীয় প্রজাতি, সঠিক স্থান আর দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ছাড়া শুধু গাছ লাগানোয় লাভ নেই; গাছকে বাঁচিয়ে রাখাটাই আসল সাফল্য।

জলবায়ু যুদ্ধে বৃক্ষের ভূমিকা

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বর্তমানের বাস্তবতা। এই লড়াইয়ে বৃক্ষ কাজ করে প্রকৃতির নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে। কার্বন শোষণ করে, তাপ কমায়, আর দুর্যোগের সামনে দাঁড়ায় প্রথম প্রাচীর হয়ে। উপকূলে ঝাউ, কেওড়া, গেওয়া আর গোলপাতা ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক বেষ্টনী তৈরি করে; পাহাড়ে গাছের শিকড় ঠেকায় ভূমিধস; নদীতীরে রুখে দেয় ভাঙন। একই সঙ্গে একটি সমৃদ্ধ বনভূমি মানে হাজারো পাখি, প্রাণী, পতঙ্গ আর অণুজীবের নিরাপদ ঠিকানা। বনভূমি সংকুচিত হওয়া মানে খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়া, পরাগায়নকারী পোকামাকড় কমে যাওয়া, কৃষির ভারসাম্য নষ্ট হওয়া।

কৃষির কথা যখন উঠলই—বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি প্রকৃতির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। ফসলের পাশাপাশি ফলজ-বনজ-ঔষধি গাছের সমন্বিত চাষ (অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি) কৃষকের জন্য বাড়তি আয়ের পথ খুলে দিতে পারে। বসতবাড়ির আশপাশে লাগানো একেকটা গাছ আসলে ভবিষ্যতের জন্য একটা "সবুজ সঞ্চয়"—আজ পুষ্টি জোগায়, কাল ফল বিক্রির আয়, আর একদিন কাঠ বিক্রির মাধ্যমে দেয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।

বৃক্ষ ও পর্যটন: যে সম্পর্ক অনেকেই খেয়াল করেন না

অনেকে ভাবেন বৃক্ষরোপণ শুধুই পরিবেশের বিষয়। বাস্তবে এর সঙ্গে পর্যটনের সম্পর্ক নিবিড়। বিশ্বের সফল পর্যটন গন্তব্যগুলো সবার আগে গুরুত্ব দেয় প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে—কারণ বন, পাহাড়, নদী, জলাভূমি আর জীববৈচিত্র্যই একটি দেশের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটের চা-বাগান, মধুপুরের শালবন, শেরপুর-নেত্রকোণার গারো পাহাড়, টাঙ্গুয়ার হাওর, সোনাদিয়া দ্বীপ, কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটা—বাংলাদেশের এই গন্তব্যগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় ঠিক এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই। যেখানে গাছ কমে, সেখানে তাপ বাড়ে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়, আর পর্যটনের আকর্ষণও ফিকে হয়ে যায়। উল্টোদিকে পরিকল্পিত সবুজায়ন যেকোনো এলাকাকে পরিণত করতে পারে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গন্তব্যে। তাই এক লাইনে বললে—সবুজায়নে বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যতের টেকসই পর্যটনে বিনিয়োগ।

তরুণ সমাজ ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব

বাংলাদেশে হাজার হাজার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সক্রিয়। যদি প্রতিটি সংগঠন বছরে অন্তত ১,০০০টি গাছ রোপণ ও তিন বছর পরিচর্যার অঙ্গীকার করে, অল্প কয়েক বছরেই দেশে যোগ হতে পারে কোটি কোটি নতুন গাছ। কিন্তু শর্ত একটাই—এই কর্মসূচি যেন ছবি তোলার আনুষ্ঠানিকতায় আটকে না থাকে। প্রয়োজন দেশীয় প্রজাতির চারা, সঠিক মৌসুমে রোপণ, নিয়মিত পরিচর্যা, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, আর প্রতিটি গাছের অবস্থান ডিজিটালি সংরক্ষণ করে অন্তত তিন বছরের পর্যবেক্ষণ। কথাটা এভাবে বলা যায়—আজ দরকার শুধু "Plant a Tree" নয়, বরং "Plant, Protect and Preserve"

দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে এই আন্দোলনের নেতৃত্বে আনা গেলে সময় বেশি লাগবে না। প্রতিটি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হতে পারে "এক শিক্ষার্থী—একটি গাছ" কর্মসূচি; স্কাউট, রোভার, বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্টের মতো প্ল্যাটফর্মে "এক তরুণ—দশ গাছ"। শুধু গাছ লাগানো নয়, তার বেড়ে ওঠা পর্যবেক্ষণ আর তথ্য সংরক্ষণও হতে পারে তাদের স্বেচ্ছাসেবী কাজের অংশ।এছাড়া দেশের সকল ব্যবসায়ী সংগঠন, বিশেষ করে পর্যটন সংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও এনজিও গুলোকে প্রতি বৎসর বাধ্যতামূলক বৃক্ষরোপন, পরিচর্যা ও তার রিপোর্ট সংশ্লিস্ট দপ্তরে জমা প্রদানের প্রথা চালু করা যায়।

কর্পোরেট বাংলাদেশ: CSR থেকে CRF-এর পথে

বাংলাদেশে শত শত ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর, পোশাক শিল্প, ওষুধ-সিমেন্ট-ইস্পাত কোম্পানি প্রতিবছর CSR খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। এই তহবিলের একটি বড় অংশ পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারে ব্যয় করা গেলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশে ঘটতে পারে প্রকৃত এক সবুজ বিপ্লব। এটি দান নয়— পরিবেশের পাওনা মেঠানো এবং ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ।

আমার প্রস্তাবিত কয়েকটি মডেল হতে পারে বাস্তবসম্মত বৃক্ষায়নের সফল রোড়ম্যাপ:

  • "এক প্রতিষ্ঠান – এক লক্ষ গাছ": প্রতিটি বড় প্রতিষ্ঠান পাঁচ বছরে অন্তত এক লক্ষ গাছ রোপণ ও পরিচর্যার দায়িত্ব নেবে—নদীতীর বনায়ন, মহাসড়কের পাশে গাছ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফলের বাগান, উপকূলে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার কিংবা নগর উদ্যানের মাধ্যমে।
  • শিল্পাঞ্চলে "গ্রিন বাফার জোন": প্রতিটি কারখানার চারপাশে ২০–৫০ মিটার সবুজ বেষ্টনী বাধ্যতামূলক করা গেলে কমবে ধুলো, শব্দ আর বায়ুদূষণ।
  • ডিজিটাল ট্রি মনিটরিং: GPS, QR কোড, ড্রোন ও স্যাটেলাইট মনিটরিং ব্যবহার করে জানা যাবে কোন প্রতিষ্ঠান কতটি গাছ লাগিয়েছে, আর তার মধ্যে কতগুলো এখনো বেঁচে আছে—এতে বাড়বে স্বচ্ছতা।
  • উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ কর্মসূচি: রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষত পোশাক ও জ্বালানি খাত, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী ও নদীমোহনা পুনরুদ্ধারে অর্থায়ন করতে পারে—যা একই সঙ্গে পূরণ করবে আন্তর্জাতিক ESG মানদণ্ডও।
  • "Green Company Award": সর্বাধিক বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যাকারী প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিলে তৈরি হবে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা।

এই প্রেক্ষাপটেই সময় এসেছে CSR-কে শুধু দাতব্য কার্যক্রম না ভেবে Corporate Responsibility Fund (CRF) তৈরি করার মাধ্যমে বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগ গ্রহন করা। যে প্রতিষ্ঠান পরিবেশে বিনিয়োগ করে, সে আসলে বিনিয়োগ করে নিজের ভবিষ্যৎ বাজার আর স্থায়িত্বেই।

আমি একটি জাতীয় প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব করছি—"Green Bangladesh CSR Alliance"—যেখানে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিবেশ-বন-জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে একটি জাতীয় বৃক্ষরোপণ তহবিল গঠন করবে—প্রতি বছর অন্তত ১-২ কোটি দেশীয় বৃক্ষরোপণ, পাঁচ বছর পরিচর্যা, GPS-ভিত্তিক মনিটরিং, স্বাধীন নিরীক্ষা আর বার্ষিক Green Bangladesh Report প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে বাস্তবায়ন করা।

বিশ্ব যা করে দেখিয়েছে

বাংলাদেশ একা নয়—পৃথিবীর অনেক দেশ প্রমাণ করেছে, সদিচ্ছা থাকলে বনায়নে বিস্ময়কর সফলতা অর্জন সম্ভব। চীনের Three-North Shelterbelt Program (Great Green Wall) কয়েক দশক ধরে কোটি কোটি গাছ লাগিয়ে মরুকরণ ঠেকিয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য একদিনেই কোটি কোটি গাছ রোপণের নজির গড়েছে, নাগরিক আর শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে একে পরিণত করেছে সামাজিক আন্দোলনে। পাকিস্তানের Billion Tree Tsunami প্রকল্প বনায়নের পাশাপাশি তৈরি করেছে নতুন কর্মসংস্থান। আর ইথিওপিয়া একদিনেই কোটি চারা রোপণ করে দেখিয়ে দিয়েছে। বৃক্ষরোপন ও পরিচর্যায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ করাতে পারাই আসল শক্তি।

এই উদাহরণগুলো একটাই বার্তা দেয়—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আর জনগণের সম্পৃক্ততা একসঙ্গে থাকলে পরিবেশগত পরিবর্তন অসম্ভব কিছু নয়।

প্রযুক্তি যেভাবে বদলে দিতে পারে বনায়নকে

আগামী দিনের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি কেবল চারা বিতরণ বা আনুষ্ঠানিক রোপণ অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। আমাদের অগ্রসর হতে হবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর (Data-driven) এবং স্মার্ট বনায়ন (Smart Afforestation) ব্যবস্থার দিকে, যেখানে প্রতিটি বৃক্ষ হবে একটি নিবন্ধিত পরিবেশগত সম্পদ (Environmental Asset)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), Geographic Information System (GIS), Remote Sensing, Satellite Monitoring, Drone Survey এবং Carbon Accounting System-এর সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে একটি জাতীয় পর্যায়ের ডিজিটাল বন ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা সম্ভব।

এই প্রযুক্তিগুলোর মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে জানা যাবে—কোন এলাকায় কী প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে, কত শতাংশ চারা জীবিত রয়েছে, কোন অঞ্চলে পরিচর্যার ঘাটতি রয়েছে, কোথায় বন উজাড় বা অবৈধ দখলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে এবং কোন এলাকায় নতুন বনায়ন সবচেয়ে জরুরি। একই সঙ্গে গাছের উচ্চতা, বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য, ছাউনির বিস্তার (Canopy Cover), কার্বন শোষণের পরিমাণ (Carbon Sequestration), জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন এবং জলবায়ু অভিযোজনের অগ্রগতিও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।

এ লক্ষ্যে প্রতিটি বৃক্ষের জন্য একটি “Digital Tree Passport” চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি চারায় একটি QR Code বা RFID Tag সংযুক্ত থাকবে, যা স্ক্যান করলে গাছটির প্রজাতি, রোপণের তারিখ, রোপণকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, সুনির্দিষ্ট GPS অবস্থান, পরিচর্যার ইতিহাস, বৃদ্ধির তথ্য, কার্বন শোষণের আনুমানিক হিসাব এবং সর্বশেষ পর্যবেক্ষণের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে দেখা যাবে। এর ফলে একটি গাছও আর শুধু একটি চারা থাকবে না; বরং এটি একটি ডিজিটালভাবে নিবন্ধিত প্রাকৃতিক সম্পদ (Digitally Registered Natural Asset) হিসেবে জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের অংশ হয়ে উঠবে।

এই ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা শুধু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে না, বরং সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের CSR/CRF কর্মসূচি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক—সবার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। একই সঙ্গে জাতীয় কার্বন ইনভেন্টরি, কার্বন ক্রেডিট বাজারে অংশগ্রহণ, জলবায়ু অর্থায়ন (Climate Finance) অর্জন এবং আন্তর্জাতিক ESG (Environmental, Social and Governance) মানদণ্ড পূরণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হবে কেবল গাছ লাগানোর উদ্যোগ নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভূ-তথ্য প্রযুক্তি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত একটি স্মার্ট, টেকসই ও জবাবদিহিমূলক জাতীয় সবুজায়ন আন্দোলন

শেষ কথা: একটি গাছ, একটি অঙ্গীকার

বাংলাদেশ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (বিশেষত SDG-১৩ ও SDG-১৫), প্যারিস চুক্তি এবং জীববৈচিত্র্য সংক্রান্ত কনভেনশনের (CBD) অংশীদার হিসেবে যে অঙ্গীকার করেছে, তা পূরণের পথ একটাই—বৃহৎ পরিসরে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, বন সংরক্ষণ আর সামাজিক বনায়ন।

সরকার, বেসরকারি খাত, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তরুণ সমাজ আর সাধারণ মানুষ—সবাই যখন একসঙ্গে হাঁটবে, তখনই সম্ভব হবে সত্যিকারের সবুজ বাংলাদেশ। একটা গাছ লাগানো সহজ; তাকে বাঁচিয়ে রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ আর আসল দায়িত্ব।

আজ, এই মুহূর্ত থেকেই শুরু হোক সেই অঙ্গীকার— বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।

লেখক: আসাফ উদ্ দৌলা (আশেক)

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত