বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস ২০২৬: " দক্ষতায় গড়ি সম্মিলিত ভবিষ্যৎ " বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভাবনা


  আসাফ উদ্ দৌলা (আশেক)

প্রকাশ :  ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:২৪ রাত

প্রতি বছর ১৫ জুলাই জাতিসংঘ ঘোষিত  World Youth Skills Day অর্থাৎ বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস পালিত হয় একটি গভীর বার্তা নিয়ে। জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণদের হাতে থাকা দক্ষতার উপর। UNESCO-UNEVOC কর্তৃক ঘোষিত বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য, "Skills for a Shared Future" — অর্থাৎ “দক্ষতায় গড়ি সম্মিলিত ভবিষ্যৎ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে- দক্ষতা উন্নয়ন এখন আর ব্যক্তি পর্যায়ের বিষয় নয়; এটি সামষ্টিক দায়িত্ব, যার ওপর নির্ভর করছে সামাজিক সংহতি, শান্তি এবং টিকে থাকার মত টেকসই উন্নয়ন।

Activity for Reformation of Basic Needs (ARBAN) সহ আরও অসংখ্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের জন্য এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০২ সাল থেকে "Education for Liberation" স্লোগান ধরে নেত্রকোণা  থেকে শুরু করে ময়মনসিংহ, জামালপুর, কক্সবাজার, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে দক্ষতা উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে আসা ARBAN জানে—দক্ষতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি দারিদ্র্য থেকে মুক্তির প্রকৃত হাতিয়ার।

বৈশ্বিক বাস্তবতা: দক্ষতা ঘাটতির ভয়াবহ চিত্র যা নীরবে চিৎকার করে

UNESCO-UNEVOC-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী দক্ষতা ঘাটতির চিত্রটি ভয়াবহ:

  • বিশ্বব্যাপী ২৭ কোটি ৩০ লাখ শিশু ও তরুণ এখনও শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে।
  • ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী প্রতি ৫ জনের ১ জন এখনও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সংস্পর্শে আসেননি।
  • বর্তমান কর্মীবাহিনীর ৪০ শতাংশ দক্ষতা এখন আর শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে খাপ খায় না।
  • ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ২২ শতাংশ চাকরি পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে।

এই পরিসংখ্যান কোন দূরের গল্প নয়—বাংলাদেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক তরুণ-তরুণীদের বাস্তবতাও এর বাইরে নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর এবং সামাজিক জটিলতা বৃদ্ধির এই সময়ে, শুধু কারিগরি দক্ষতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তিগত, ডিজিটাল, পরিবেশগত, সামাজিক-মানসিক ও নাগরিক দক্ষতার একটি সুসমন্বিত সমন্বয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: সম্ভাবনা ও সংকট একই সঙ্গে

বাংলাদেশে বর্তমানে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই জনতাত্ত্বিক সুবিধা (Demographic Dividend) যদি সঠিক দক্ষতা উন্নয়নের সাথে যুক্ত না হয়, তাহলে তা সুযোগের বদলে ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। প্রতি বছর লক্ষাধিক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে তাদের সংযোগ এখনও সীমিত। বিশেষভাবে প্রান্তিক অঞ্চল—হাওর, চর, উপকূলীয় এলাকা ও দুর্গম পাহাড়ি জনপদের তরুণেরা এই সুযোগ থেকে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।

এখানেই TOAC ও ARBAN-এর মতো সংগঠনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। TOAC ও ARBAN দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ নারী ও তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, পর্যটন ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনায় (Tourism and Hospitality Management) দক্ষতা উন্নয়নের একটি স্বতন্ত্র শক্তিশালী অভিজ্ঞতা গড়ে তুলেছে সংগঠনগুলো। যেখানে তরুণদের হসপিটালিটি সার্ভিস, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ট্যুর গাইডিং, ইকো-টুরিজম এবং ফুড এন্ড বেভারেজ সার্ভিস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই উদ্যোগ শুধু কর্মসংস্থান তৈরি করে না, বরং বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে আরও পেশাদার, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং টেকসই করে তোলার ভিত্তি রচনা করে।

পর্যটন-কেন্দ্রিক দক্ষতা: একটি অবহেলিত সম্ভাবনার দ্বার

বাংলাদেশ পর্যটন খাত এখনও তার প্রকৃত সম্ভাবনার তুলনায় পিছিয়ে আছে। তার একটি বড় কারণ দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। কক্সবাজার, সুন্দরবন, সিলেটের চা-বাগান বা হাওর অঞ্চলে পর্যটনের  উল্লেখযোগ্য যে সম্ভাবনা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তা কাজে লাগাতে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত গাইড, আতিথেয়তা কর্মী, ইকো-টুরিজম উদ্যোক্তা এবং ডিজিটাল মার্কেটিং দক্ষতাসম্পন্ন তরুণ জনশক্তি। TOAC ও ARBAN-এর মতো সংগঠনের হসপিটালিটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এই শূন্যতা পূরণে একটি বাস্তবসম্মত মডেল হয়ে উঠতে পারে। সেই সাথে যদি এটি জাতীয় পর্যটন নীতি ও Tourism & Hospitality Industry Skills Council কাঠামোর সাথে আরও সুসংহতভাবে যুক্ত করা যায়, তবে পর্যটন কেন্দ্রিক দক্ষতা যুব কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।

সামনের পথ: অংশীদারিত্বই একমাত্র সমাধান

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য আমাদের যা শেখায়, তা হলো—দক্ষতা উন্নয়ন কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা সরকারের একক দায়িত্ব নয়। এতে প্রয়োজন:

১. সরকার ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে NSDA, DYD, TVET ও স্থানীয় NGO-চালিত দক্ষতা কর্মসূচির মধ্যে আনুষ্ঠানিক সংযোগ স্থাপন এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়াকে সহজীকরণ।

২. বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি।

৩. স্থানীয় সংগঠন যেমন BRAC, ARBAN, TOAC-এর অভিজ্ঞতাকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি ও সম্প্রসারণ।

৪. তরুণদের নিজেদের কণ্ঠস্বরকে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় জায়গা দেওয়া—যেমনটি UNESCO-UNEVOC-এর যুব জরিপ ও "Youth Voices" ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে চাওয়া হচ্ছে।

উপসংহার

দক্ষতায় গড়ি সম্মিলিত ভবিষ্যৎ "Skills for a Shared Future" কেবল একটি প্রতিপাদ্য নয়—এটি একটি আহ্বান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আহ্বানের অর্থ হলো, প্রান্তিক জনপদের একজন তরুণীকেও যেন সমান সুযোগ দেওয়া হয় দক্ষতা অর্জনের, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থানের এবং একটি ভাগাভাগি করা, টেকসই ভবিষ্যতে অবদান রাখার। ARBAN বিশ্বাস করে, বাংলাদেশ দরিদ্র নয়—বরং এটি সম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ, যার প্রকৃত সম্পদ তার মানুষ। সেই মানুষের হাতে সঠিক দক্ষতা তুলে দেওয়াই আজকের এবং আগামীর সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

সূত্র: UNESCO-UNEVOC, World Youth Skills Day 2026 ("Skills for a Shared Future")

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত