বাইকের জ্বালানি যেন সোনার হরিণ, সংকট নিরসনে করণীয়
মো: জায়েজুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৩৭ দুপুর

ভাই, পেট্রোল আছে?
— নাই। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় দেওয়া যাবে। দাম লাগবে তিন টাকা, মানে তিনশ টাকা লিটার।
বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে, লাগলে নেব। তারপর ফিরতি পথে আরেক বিক্রেতার কাছে চাইলাম। সে এক লিটার বের করে দিল। দাম তিনশ টাকা চাইল। বিশ টাকা কমিয়ে দিয়ে নিয়ে নিলাম—না হলে গাড়ি রাস্তায় ঠেলতে হতে পারে এই শঙ্কায়।
তার আগে একজন এনজিও লেডি অফিসার বাইক চালিয়ে অফিসে যাচ্ছিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, তেল কীভাবে পাচ্ছেন? উত্তরে বললেন, “আর বলবেন না ভাই, একদিন আগে দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পেয়েছিলাম দুইশ টাকার, আর আজ ভোরে দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পর দিয়েছে মাত্র একশ টাকার। এখন দেখেন, তেলের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে অফিস করতে পারছি না।”
গত মঙ্গলবার সহকর্মীর বাইকে করে পূর্বধলা থেকে ঘাগড়া কর্মস্থলে যাওয়া-আসার সময় এমন তথ্য জানা গেছে। তেলের সংকটের কারণে বাইক চালকদের প্রতিনিয়ত এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। পাম্পগুলোতে প্রতিদিন তেল দেওয়ার সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। শেষে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকার তেল। ১৫০ সিসির একটি মোটরসাইকেলে এই ২০০ টাকার জ্বালানি দিয়ে পথচলা যায় মাত্র ৫০ কিলোমিটার। দূরের যাত্রায় ৫০ কিলোমিটার যাওয়ার পর আর জ্বালানি পাওয়া যায় না, তখন আবার পড়তে হয় বিড়ম্বনায়।
উপজেলায় ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালান বিশকাকুনি ইউনিয়নের জামাইকোনা গ্রামের রুবেল মিয়া। তিনি জানান, “সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত লাইনে থেকে পূর্বধলা ফিলিং স্টেশন থেকে মাত্র ৩০০ টাকার তেল পেয়েছি। দিনের বেশির ভাগ সময় চলে যায় তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে। ভাড়া মারব কখন? সংসার চালানো দায় হয়ে গেছে।”
ঔষধ কোম্পানিতে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, “ভাই, চাকরির পেছনে দৌড়াব না তেলের পেছনে দৌড়াব? জীবনটা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
ঘাগড়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাওলানা আসাদুল হক জানান, “গত পরশুদিন রাত ১০টার সময় পাম্পে গিয়ে সারারাত অপেক্ষা করে ফজরের নামাজের সময় তিনশ টাকার তেল নিয়ে ফিরতে হয়েছে।”
নজরুল ইসলাম নামে এক বাইক চালক চরপাড়া থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আতকাপাড়া গিরিপথ ফিলিং স্টেশনে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে শেষে পেয়েছেন মাত্র একশ টাকার তেল, যা তার আসা-যাওয়াতেই শেষ হয়ে যাবে। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা সৃষ্টি হলে পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের কিছুই করার নেই।
তেলের এমন সংকটে অনেকেই বাইক চালানো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। মৌদাম সেসিপ মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বাইকের জ্বালানি না পেয়ে প্রতিদিন ৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যান। অবশ্য এর মাধ্যমে তিনি ডাক্তারি নির্দেশনা অনুযায়ী হাঁটার কাজটুকুও সেরে নিচ্ছেন।
জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত এমন নতুন নতুন ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমানে এক লিটার তেল যেন সোনার হরিণ। পাম্পগুলোতে মাঝেমধ্যে মারামারি ও হাতাহাতির মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটছে। যতই দিন যাচ্ছে, ততই সংকট আরও প্রকট হচ্ছে। পাম্প মালিকরা অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
তবে এত কিছুর মাঝেও তেল বিক্রি নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠছে পাম্প কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। কিছু অসাধু চক্র নানা কৌশলে তেল সংগ্রহ করে বিভিন্ন জায়গায় বেশি দামে বিক্রি করছে।
বর্তমানে পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হলেও এটিকে যথেষ্ট মনে করছেন না ক্রেতারা। আবার পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের তেল উত্তোলনের হিসাব চালান দেখানো ছাড়াই শুধুমাত্র লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে। এতে অনেকেই মনে করছেন প্রকৃত উত্তোলন ও স্টকের হিসাব সঠিকভাবে দেখানো হচ্ছে না। এজন্য প্রশাসনিক নজরদারি আরও বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন সচেতন মহল।
জ্বালানি তেলের এই সংকট মোকাবিলায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:
১। যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া কোনো মোটরসাইকেল বা গাড়িতে জ্বালানি না দেওয়া।
২। প্রকৃত বাইক চালকদের জন্য ফুয়েল কার্ড চালু করা।
৩। অনুমোদন ছাড়া ড্রাম, ট্যাংকি, বোতল বা অন্য কোনো পাত্রে তেল বিক্রি না করা।
৩। অনুমোদন ছাড়া ড্রাম, ট্যাংকি, বোতল বা অন্য কোনো পাত্রে তেল বিক্রি না করা।
৪। প্রতিবার ফুয়েল নেওয়ার সময় ফুয়েল কার্ড প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা এবং তথ্য সংরক্ষণ করা।
৫। কেউ মজুদ বা খোলা বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে তেল নিতে চাইলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
৬। সংকটময় পরিস্থিতিতে সাশ্রয়ী ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা।
৭। তেল দেওয়ার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশি প্রহরা জোরদার করা।
৮। একই ব্যক্তি বা বাইক বারবার তেল নেওয়া ঠেকাতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা।
এছাড়া জরুরি বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশি কার্যক্রম, গণমাধ্যমকর্মী ও চাকরিজীবীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উপজেলার তিনটি ফিলিং স্টেশন—গিরিপথ, জমজম ও পূর্বধলা ফিলিং স্টেশনে নিয়মিত কঠোর নজরদারি জোরদার করা দরকার।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ সংকট সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সেই প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। সরকার সারাদেশে জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করছে। বর্তমানে অকটেন ও পেট্রোলে অস্থিরতা দেখা দিলেও ডিজেলের ক্ষেত্রে যেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
বর্তমান সংকট সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
মো: জায়েজুল ইসলাম
নির্বাহী সম্পাদক
আজকের আরবান।

_original_1757748225_medium_1774007230.jpg)
_original_1757748225_medium_1773037639_medium_1773337662.jpg)
_original_1757748225_medium_1773037639.jpg)
_medium_1772351421.jpg)
