বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম

অপচয়ের ঘূর্ণাবর্তে দেশ ও সমাজ: সময়, মেধা ও বোধকে বাঁচানোর আকুল আর্জি


  ইঞ্জিনিয়ার শাহীন সরদার

প্রকাশ :  ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০২:৫৫ দুপুর

​বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম। সমস্ত প্রশংসা একমাত্র পরম করুণাময় মহান আল্লাহ তাআলার।

​অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম মনের ভেতর জমে থাকা এক গভীর আক্ষেপ আর অনুশোচনার কথা দেশবাসীকে বলব। আজ না বললে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। আমরা অপচয় বলতে বুঝি কী? সামান্য দু-মুঠো ভাত ফেলে দেওয়া, খোলা কল দিয়ে টপটপ করে পানি পড়া, কিংবা ঘরের বাতিটা অহেতুক জ্বালিয়ে রাখা—একেই তো আমরা সাধারণ চোখে অপচয় বলি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, রক্তের বিনিময়ে কেনা এই স্বাধীন দেশে প্রতিদিন আমাদের অজান্তে যে দু’টি সবচেয়ে মহামূল্যবান আমানতের অপচয় ঘটে যাচ্ছে, তার হিসাব কে রাখবে? সেই দু’টি সম্পদ হলো আমাদের মূল্যবান ‘সময়’ এবং যুবসমাজের ‘মেধা’।

​পানির অপচয় বন্ধ করলে নদী বাঁচবে, বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করলে কোষাগার বাঁচবে; কিন্তু মেধা আর সময়ের অপচয় হলে যে আস্ত একটি জাতি নিঃস্ব হয়ে যায়! একটি সমাজ বা রাষ্ট্র তখনই মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, যখন তার সন্তানেরা সম্পদের সুষম ব্যবহারের পাশাপাশি মেধার প্রতি সুবিচার করতে শেখে।

​১. প্রযুক্তির দেখনদারি ও পিতার রক্তের সাশ্রয়
​আজকের তরুণদের দেখি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার নাম করে বাবা-মায়ের ওপর জেদ ধরে। পড়াশোনা বা গবেষণার জন্য কম্পিউটার লাগবে—খুব ভালো কথা, শিক্ষার চেয়ে বড় শক্তি আর কী হতে পারে? কিন্তু কষ্ট লাগে তখন, যখন দেখি সাধারণ অ্যাসাইনমেন্ট বা টাইপিংয়ের কাজের জন্য কোর-আই-৩ (Core i3) মানের প্রসেসরই যেখানে যথেষ্ট, সেখানে আমার সন্তানটি আবদার করে বসেছে কোর-আই-৭ (Core i7) কিংবা সর্বাধুনিক ১২তম, ১৩তম, ১৪তম জেনারেশনের বিপুল দামি ল্যাপটপের!

​সন্তানের আবদার মেটাতে গিয়ে গ্রামগঞ্জের শত শত কৃষক-শ্রমিক পিতা জমি বিক্রি করছেন, এনজিও থেকে চড়াসূদে ঋণ নিচ্ছেন, রক্ত পানি করা উপার্জনের পুরোটা ঢেলে দিচ্ছেন। অথচ সেই সন্তানটি পড়ালেখা শেষ করে চার বছর পর যে পিসি ফেরত নিয়ে ঘরে ফেরে, দেখা যায় তার ধারণক্ষমতা ও প্রসেসিং পাওয়ারের মাত্র ১০ শতাংশও সে কোনোদিন কাজে লাগায়নি! প্রযুক্তি পুরোনো হয়ে যায়, ডিভাইসের মূল্য শূন্যে নেমে আসে, আর পিতার ঘামের দাম ভেসে যায় জলে। এটি কেবল টাকার অপচয় নয়, এটি তরুণের নিজের ব্যক্তিগত কর্মক্ষমতাকে প্রযুক্তির দাসে পরিণত করার এক ভয়াবহ মানসিক অপচয়।

​আমার সোজা কথা: সাধ্য আর প্রয়োজনের সীমারেখা যে জাতি আঁকতে পারে না, দেখনদারি আর বিলাসিতা দিয়ে তারা আর যা-ই হোক, উন্নত সমাজ গড়তে পারে না।

​২. ডিগ্রির মোহ, কাগজের সার্টিফিকেট ও মেধার আত্মহত্যা
​উচ্চশিক্ষার নামে আমাদের দেশে আজ এক আজব ব্যাধি দেখা দিয়েছে। স্নাতক সম্পন্ন করেই যোগ্যতা অর্জন বা কর্মসংস্থানের দিকে না গিয়ে সবাই ছুটছে মাস্টার্স, এমবিএ আর পিএইচডির মোহের পেছনে। যেন সমাজকে কেবল গলার জোরে বলতে হবে—“আমি মাস্টার্স পাস!”

​কিন্তু আমার প্রশ্ন, ডিগ্রির এই বিশাল বহর দিয়ে আমরা কী করব, যদি হাতে কোনো প্র্যাকটিক্যাল দক্ষতা না থাকে? বিশ্বজুড়ে আজ সনদের গাদা নয়, কাজের দক্ষতাকে সেলাম ঠোকা হয়। বহু তরুণ শুধু স্নাতক পাস করেই নিজের যোগ্যতাবলে বিশ্ব জয় করছে।

​সবচেয়ে বড় কষ্ট পাই যখন দেখি, আমাদের সমাজের অনেক মেয়েকে উচ্চশিক্ষার নামে বছরের পর বছর মাস্টার্স-পিএইচডিতে আটকে রাখা হয়, অথচ পরবর্তীতে তারা নিজেদের স্বাধীন ইচ্ছায় কিংবা সংসারের তাগিদে নিবেদিত গৃহিণী হন। গৃহিণী হওয়া মোটেও ছোট কাজ নয়; একটি সৎ ও চরিত্রবান সন্তান গড়ে তোলার পেছনে মায়ের ভূমিকা সর্বাগ্রে। কিন্তু গৃহিণী হওয়ার জন্য বা সন্তানকে প্রাথমিক পড়ালেখা শেখানোর অজুহাতে জীবনের সেরা পাঁচ-ছয়টি বছর শুধু ডিগ্রির পেছনে নষ্ট করার কী অর্থ থাকতে পারে?
​আমাদের ছোটবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে শিক্ষকেরা আমাদের আলো দেখিয়েছেন, তারা তো উচ্চ ডিগ্রির বহর নিয়ে আসেননি। তারা এস.এস.সি বা এইচ.এস.সি পাস করেই এক একজন আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন। তাহলে সন্তানকে মানুষ করার অহেতুক অজুহাত দেখিয়ে নিজেদের মেধা আর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোকে ডিগ্রির বাক্সে বন্দি করে রাখা কি মেধার অপচয় নয়?

​৩. ডিজিটাল বর্জ্য ও অন্তরের অবক্ষয়
​আমাদের পতন কেবল বাইরে নয়, ঘরের ভেতর পর্যন্ত ঢুকে পড়েছে। আজকের তরুণ থেকে প্রবীণ—সবার হাতে হাতে এক একটি স্মার্টফোন। সেই ফোনের গ্যালারিতে গিয়ে দেখুন, অহেতুক হাজার হাজার মেমে, অপ্রয়োজনীয় ছবি আর আজব ফাইল দিয়ে মেমোরি লোড করা।

​ফোনের মেমোরির চেয়ে বড় সংকট আমাদের মাথার ভেতর। আমরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সমাজমাধ্যমের অনর্থক জঞ্জাল, গুজব ও অশ্লীলতা দিয়ে আমাদের মস্তিষ্ককে লোড করে রাখছি। একটি অপরিষ্কার পাত্রে যেমন বিশুদ্ধ দুধ রাখা যায় না, তেমনি অপ্রয়োজনীয় আর ক্ষতিকর চিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকা মস্তিষ্কে কোনো মহৎ চিন্তা প্রবেশ করতে পারে না। যদি ব্রেনকে অনর্থক তথ্য থেকে মুক্ত রাখা যায়, তবেই সেখানে সততা, প্রেম, স্বাজাত্যবোধ ও মানবসেবার সৎ ইচ্ছা জন্ম নেবে।

​জাতীয় পুনর্গঠনে বিশেষ প্রস্তাবনা:
​১. প্রয়োজন ও বিলাসের ফারাক বুঝতে হবে: ল্যাপটপ বা প্রযুক্তি সামগ্রী কেনায় আত্মপ্রচার বাদ দিয়ে প্রকৃত কাজের ওপর নির্ভর করে সাশ্রয়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
২. সনদসর্বস্ব না হয়ে দক্ষতামুখী হওয়া: ডিগ্রির পেছনে না ছুটে হাতে-কলমে কাজ শিখুন। সার্টিফিকেট দিয়ে পেট ভরবে না, দক্ষতা দেশকে পথ দেখাবে।
৩. সময়ের আমানত রক্ষা করা: শিক্ষা গ্রহণ অবশ্যই মৌলিক অধিকার, কিন্তু তা যেন শুধু সামাজিকভাবে নাম কুড়ানোর মাধ্যম না হয়ে দেশ ও পরিবারের কাজে লাগে।
৪. ডিজিটাল বর্জ্য সাফাই (Digital Detox): মুঠোফোনের অনর্থক ব্যবহার বন্ধ করে মানব মস্তিষ্ককে নীতি-নৈতিকতা ও প্রগতির চিন্তায় নিয়োজিত রাখতে হবে।
৫. পারিবারিক সংযম ও মূল্যবোধের চর্চা: পরিবার থেকেই সন্তানকে অপচয়বিরোধী পাঠ দিতে হবে। যে সন্তান অপচয় রুখতে শেখে, সে কোনোদিন দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে না।

​শেষ কথা-
​পরিশেষে স্পষ্ট করে বলতে চাই—অপচয় রোধ বা মিতব্যয়িতা কোনো কাঙালপনা নয়, এটি একটি বীরত্বপূর্ণ মহৎ গুণ। আমাদের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের সাশ্রয় তো করতেই হবে; কিন্তু তারচেয়েও আগে সময়, মেধা ও চিন্তার অপচয় বন্ধ করতে হবে।

​আসুন, আমরা দেখনদারির রাজনীতি ও সামাজিক ভণ্ডামি পরিহার করি। নিজের রক্তপানি করা অর্থ, মূল্যবান সময় ও সুপ্ত মেধার সঠিক মূল্যায়ন করে সোনার বাংলাদেশকে সত্যি সত্যিই এক স্বনির্ভর ও নীতিবান জাতিরূপে গড়ে তুলি। অপচয়মুক্ত সমাজ গড়াই হোক আজকের দিনের প্রধান সামাজিক লড়াই।
​আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

 

​​ইঞ্জিনিয়ার শাহীন সরদার
মেম্বার, আইডিইবি, এনটিবি কিউএফ (NTVQF), বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
সাধারণ সম্পাদক, আইডিইবি (IDEB) আইডিয়া।
সিইও, সানমার্ক মিডিয়া কমিউনিকেশন।
ফাউন্ডার জিএসএফ (GSF) ফাউন্ডেশন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত