বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম

শেরপুর মেডিকেল কলেজ এর জায়গা নির্ধারণ নিয়ে চলছে রশি টানাটানি ! 


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২০ রাত

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেষা পিছিয়ে থাকা শেরপুর জেলার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে স্বপ্নের মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। 

বিগত ১৭ বছর জেলার মন্ত্রী-এমপিদের কথার ফুলঝুরিতে সময় পার হলেও প্রতিষ্ঠা হয়নি মেডিকেল কলেজ। তবে নতুন বাংলাদেশের নতুন সরকার এসেই মাত্র ছয় মাসের মাথায় শেরপুরে মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে। 

ইতিমধ্যে গত ৮ জুন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল শেরপুর সরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের লক্ষ্যে পৌর এলাকাসহ সদর উপজেলার পাঁচটি সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছে। 

দলটির নেতৃত্ব দেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. ফারুক আহাম্মদ। সরেজমিন পরিদর্শনের পর তারা স্থানগুলোর ভৌত অবকাঠামো ও অবস্থান পর্যালোচনা করেন।

পরিদর্শনকৃত স্থানগুলো হলো, পৌরসভার নৌহাটা খোয়াপাড়, নোহাটা অর্কিড, ঢাকোলহাটি, মোবারকপুর ইসলিবিল এবং সদর উপজেলার শেরি বীজ সংলগ্ন লছমনপুর গ্রামের পূর্ব পাশে এবং পশ্চিম পাশ।

এদিকে এই স্থান পরিদর্শনের পর থেকেই শহর জুড়ে চলছে নানা জল্পনা কল্পনা কোথায় হবে মেডিকেল কলেজ। কেউ বলছেন শহরের উত্তর, আবার কেউ বলছেন শহরের দক্ষিণে। 

বিগত সরকার সময় গুলোতে জেলার পূর্বাঞ্চল-পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে রশি-টানাটানির কারণে মেডিকেল কলেজ, রেললাইন, বিশ্ববিদ্যালয় কোন কিছুই প্রতিষ্ঠা হয়নি। 

এই নতুন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সময় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায়ে এসে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে চলছে উত্তর অঞ্চল-দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে রশি টানাটানি। এতে সাধারণ মানুষ আবারও আশঙ্কা করছে তারা কী সত্যিই এই মেডিকেল কলেজ পাবে !

এ বিষয়ে চাপাতলী মহল্লার রিকশাচালক হাসেম জানায়, মেলাদিন ধইরা হুন্তাছি (অনেকদিন ধরে শুনছি) শেরপুরে মেডিকল কলেজ ও হাসপাতাল হবে। কই হইবে (কোথায় হবে) সেটা বিষয় না অনেক দিন পর আমগোরে (আমাদের) শেরপুরে মেডিকেল কলেজ হইতেছে (হচ্ছে) এটাই বড় বিষয়। 

সদর উপজেলার লছমনপুর ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মিয়া বলেন, আমরা গরীব মানুষ চিকিৎসার জন্য শহরে যেতে অনেক টাকা লাগে শহরের বাইরে আমাদের এই এলাকায় (চলাঞ্চল) হলে সবচেয়ে ভালো হয়। বাজিতখিলা ইউনিয়নের কুমরি গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, যেনু ইচ্ছা হেনু ওইগ্গা, (যেখানে ইচ্ছা সেখানে হোক) আমরা উন্নত চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল চাই শেরপুরে।

নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘জনউদ্যোগ’ এর আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল যেখানে হবে সেখানে পরিবেশগত দিক প্রাধান্য দেয়া উচিত। যেমন শিল্পাঞ্চল, জলমহল ও বিল এলাকা, তিন ফসলের জমি, এবং ঘনবসিত এলাকার বাইরে অবশ্যই যেতে হবে। সেই সাথে এখানে শুধু জেলার মানুষ নয় জেলার বাইরে বিভিন্ন জেলার শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করবে সে কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থারও সহজ ও স্বাচ্ছন্দ হতে হবে। 

এ বিষয়ে শেরপুর ডায়াবেটিস সমিতির সভাপতি ও বিশিষ্ট সমাজসেবক রাজিয়া সামাদ ডালিয়া বলেন, শহরের উত্তর প্রান্তে যেখানে জেলার তিনটি উপজেলা এবং জামালপুর, রৌমারী ও ময়মনসিংহ জেলার আরো কয়েকটি উপজেলার মিলনস্থল, সেখানে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালটি হলে কয়েক লক্ষ মানুষের যাতায়াতের সহজ হবে।

শেরপুর-১ (সদর) আসনের প্রধান বিরোধীদল জামায়াতের সাংসদ হাফেজ রাশেদুল ইসলাম বলেন, শেরপুর জেলা শহরের সাথে কুড়িগ্রাম, জামালপুর এবং ময়মনসিংহ জেলার ১০-১২টি উপজেলা কানেক্টেড। দৈনন্দিন কাজ এবং শিক্ষার সাথে এ এলাকার চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দু শেরপুর শহর। সে মোতাবেক মেডিকেল কলেজের জায়গা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই ১০-১২টি উপজেলার সহজ যোগাযোগের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সেই দিক থেকে নৌহাটা, খোয়ারপাড় বা মোবারকপুর এলাকা সকল দিক থেকে বেটার হবে বলে গুণিজনেরা মনে করছেন।

শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সরকার দলীয় এমপি ফাহিম চৌধুরী বলেন, যেহেতু আমাদের এমপিদের মেডিকেল কলেজ স্থাপন বিষয়ক কোন কমিটিতে রাখা হয়নি তাই মেডিকেল কলেজ কোথায় স্থাপন হবে সে বিষয়ে আমার কোন চয়েজ বা মতামত নাই। তবে আমি চাই জেলার মিডিল পয়েন্টে হলে জেলার সকল প্রান্তের মানুষের জন্য সুবিধা হবে। 

শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের সরকার দলীয় এমপি মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, আমাদের এই মেডিকেল কলেজটি প্রতিষ্ঠা হলে শেরপুরের প্রায় ১৮ লক্ষ মানুষ সহ পুরো সংলগ্ন কুড়িগ্রাম, জামালপুর এবং ময়মনসিংহ জেলার প্রায় ছয় সাতটি উপজেলা মানুষ সুবিধা ভোগ করবে। সে কারণে এই মেডিকেল কলেজের স্থানটি এমন একটি জায়গায় হওয়া উচিত যেখান থেকে শেরপুর জেলার পাঁচটি উপজেলা এবং অন্যান্য জেলার আরো ৭টি উপজেলার সকল মানুষের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে এবং সহজেই এই মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে পারে।

এ বিষয়ে তৎকালে পরিদর্শনে এসে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডঃ ফারুক আহমেদ বলেছিলেন, আমরা সরেজমিনে জায়গা গুলো দেখলাম। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবো। পরবর্তীতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে।

এ বিষয়ে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, গত জুন মাসে মেডিকেল কলেজের জায়গা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন করে যাওয়ার পর আমি এখন পর্যন্ত অফিশিয়ালি কোন নির্দেশনা পাইনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত