রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
শিরোনাম

যে ভালোবাসার কাছে হেরে গেছে দারিদ্রতা 


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪০ দুপুর

জীবন যুদ্ধে মানুষ অনেক সময় দারিদ্রতার কাছে হেরে যায়। আবার কখনো কখনো দারিদ্রতাকে জয় করে। শেরপুরে এমনই এক ৮০ বছর বয়সের বৃদ্ধ দম্পত্তি রয়েছে যাদের ভালোবাসার কাছে দারিদ্রতা হেরে গেছে। শুধু তাই নয় হেরে গেছে শারীরিক অক্ষমতা ও বার্ধক্য জনিত রোগ বালাই।

এই দম্পত্তি হলো শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের ৮৬ বছর বয়সের বৃদ্ধ সাজু শেখ এবং ৮০ বছর বয়সের বৃদ্ধা নুরজাহান।

প্রায় ৭০ বছর আগে সাজু শেখ ও নুরজাহানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই তারা সাজু শেখের পৈত্রিক ভিটায় বসবাস করলেও আর্থিক দৈন্যতায় কাঁচা মালের ব্যবসা করতেন। কিন্তু এই সীমিত আয়ের মধ্যেও সাজু শেখ ও নুরজাহানের ভালোবাসা কমতি ছিল না। তাদের এই দীর্ঘ জীবনে তিন কন্যা ও তিন পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তিন কন্যা দীর্ঘদিন আগেই বিয়ে হয়েছে। ওই মেয়েদের কেউ কেউ কালে-ভাদ্রে বাবার খোঁজ নেয়। আর তিন পুত্রের মধ্যে একজন করোনার সময় নিরুদ্দেশ হলেও মাঝে মাঝে খোঁজখবর রাখেন তাদের। আর একজন ঢাকায় রিকশা চালায়। তিনিও বছরে দু’একবার বাড়িতে আসেন। শেরপুরের বসবাসকারী অপর পুত্র নুর ইসলাম দিনমজুর ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে বৃদ্ধ মা বাবার সাধ্যমত ভরণপোষণ ও খোঁজখবর রাখেন। কিন্তু এই দুর্মূল্যের বাজারে পুত্র নুর ইসলামের নিজের সংসারে চলে টানাটানির মধ্যে। তারও স্ত্রী চিকিৎসার অভাবে কয়েক বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তাই তার মা-বাবার ভরণপোষণ ঠিকমত করতে পারে না। 

প্রায় পাঁচ বছর আগে নুরজাহান পা পিছলে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায়। তারপর থেকেই নুরজাহান বিছানায় শয্যাসয়ী। দৈন্যতার কারণে চিকিৎসা করাতে পারছে না স্বামী সাজু শেখ। ওদিকে নুরজাহানের পুত্র নুর ইসলামও মায়ের চিকিৎসার জন্য নিরুপায়। 

এমনই অবস্থায় সাজু শেখ তার স্ত্রীর প্রতি চরম ভালবাসার কারণে অসুস্থ হওয়ার পরও অদ্যাবধি এক মুহূর্ত তাকে ছেড়ে কোথাও যাননি। শারীরিক অসুস্থতা ও বয়সের কারণে ইতিমধ্যে নুরজাহান প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে। বয়সের ভারে সাজু শেখও সোজা হয়ে চলতে পারেনা। বার্ধক্য তাকে করেছে বধির। জোরে জোরে কথা না বললে কারো কথা শুনতে পারে না সাজু শেখ। তবে স্ত্রীর ভালবাসার প্রতি অঢেল টান থাকায় দিনরাত ২৪ ঘন্টায় তার পাশে বসে থাকে সাজু শেখ। শয্যাসায়ী হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন সকালে সাজু শেখ স্ত্রীকে কোলে নিয়ে ঘরের দরজার বাইরে উঠোনে চটি বিছিয়ে শুইয়ে রাখেন এবং এসময়টায় সাজু‌ শেখ স্ত্রীর পাশে বসে তাকে সময় দেয় আর তাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া সোনালী কৈশোর-যৌবনের কথা ভাবেন।

সাজু শেখ কানে কম শুনলেও স্ত্রীর ইশারাতে সবকিছু বুঝে নেয়। প্রস্রাব-পায়খানা থেকে শুরু করে সকল কাজকর্ম কাঁপা কাঁপা হাতে ও ভাঙা ভাঙা শরীর নিয়ে সাজু শেখ স্ত্রীর প্রতি ভালবাসার দৃষ্টান্ত সেবা করে যাচ্ছে। 

স্থানীয়রা জানায়, সাজু শেখ অর্থের জন্য প্রায় মাঝেমধ্যে বাড়ির পাশে খুনুয়া বাজারে চলে আসে কাজের সন্ধানে। কিন্তু কঙ্কালসার দেহ দেখে কাজ দিবে কে ? তাই বাজার ঘুরে পরক্ষণেই ফিরে আসে স্ত্রীর কাছে। মাঝে মাঝে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে ফরিয়াদ করে- ”আমাদের দু’জনকে একসাথে নিয়ে যাও আল্লাহ!”

৯ সেপ্টেম্বর ঘরের দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে সাজু শেখ স্ত্রীকে কোলে নিয়ে এমনই এক কষ্টের আকুতি করেন। তিনি কান্না বিজড়িত কন্ঠে বলতে থাকেন- “আল্লাহ আমাকে খাবার দাও, আমার স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি,”। তাদের আর্তনাদ শুনে স্থানীয় এক ব্যক্তি ভিডিও করে ফেসবুকে ছেড়ে দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়। এতে বিষয়টি নজরে পড়ে শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনের। তাৎক্ষণিক সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল হাসানকে পাঠান ওই বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে। তাদেরকে দুই মাসের বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য এবং বৃদ্ধ-বৃদ্ধার পরনের কাপড়, কম্বল ও নগদ কিছু টাকা দিয়ে আসেন। একই সাথে তাদের প্রতি মাসের খাবারের দায়িত্ব নেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা বিনতে রফিক। তিনি বৃদ্ধ দম্পতির ছেলে নুর ইসলামকে বলেন, প্রতি মাসে তার অফিসে গিয়ে তার মা-বাবার জন্য খাদ্য দ্রব্য নিয়ে আসবে। এছাড়াও যদি কোন প্রয়োজন হয় জেলা এবং উপজেলা প্রশাসন থেকে দেখা হবে বলে তিনি জানায়।

এদিকে ফেসবুকের ওই পোস্ট দেখে শুক্রবার গভীর রাতে শেরপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্ত সৈনিক বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এর পক্ষ থেকেও ওই বৃদ্ধ দম্পত্তির খোঁজ খবর নেয় এবং খাদ্যদ্রব্য উপহার দেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত