পূর্বধলা সরকারি কলেজ! শিক্ষার সুষ্ঠু, সুন্দর, নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি ও কলেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত জরুরী

নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পূর্বধলা সরকারি কলেজ। ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি সুনামের সঙ্গে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বর্তমানে মানবিক, বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও কারিগরি শাখা মিলিয়ে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছেন।
প্রতিষ্ঠার কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও কলেজটিতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের ঘাটতি রয়েছে। কলেজটি সরকারি করা হলেও এখনো অনার্স কোর্স চালু হয়নি। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। তবে বর্তমানে কলেজটিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
কলেজের নিরাপত্তার জন্য পূর্ণাঙ্গ সীমানাপ্রাচীর না থাকা এবং কলেজের ভেতর দিয়ে জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা থাকায় প্রতিনিয়ত নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কলেজের মাঝখান দিয়ে রাজধলা বিলপাড়ে যাওয়ার একটি রাস্তা এবং কলেজসংলগ্ন হালটের রাস্তা-দুটিই বর্তমানে নানা জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কলেজের ভেতর দিয়ে জনসাধারণের চলাচল:
কলেজের মাঝখান দিয়ে যে রাস্তাটি রাজধলা বিলপাড়ে গিয়ে মিলেছে, সেটি দিয়ে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী চলাচল করেন। এতে একদিকে কলেজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থীও এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত যাতায়াতে বিব্রত বোধ করেন।
কলেজ প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে রাজধলা বিলপাড়ে মানুষের তেমন যাতায়াত ছিল না। পরবর্তী সময়ে ঐতিহ্যবাহী রাজধলা বিলকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। বিলের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য রাস্তা নির্মাণ, কলেজসংলগ্ন বড় ঘাট তৈরি, বিলকেন্দ্রিক কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা এবং সর্বশেষ উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শিশুদের জন্য উপজেলা প্রশাসন শিশুপার্ক নির্মাণের ফলে এলাকাটিতে মানুষের সমাগম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।এর পাশাপাশি রাজধলা মুক্তমঞ্চসহ বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় প্রতিদিনই স্থানীয় ও বাইরের দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়ছে। কিন্তু দর্শনার্থীদের জন্য কলেজের বাইরে দিয়ে একটি স্বাধীন ও বিকল্প সড়ক তৈরি না হওয়ায় পুরো চাপ এসে পড়েছে কলেজের ভেতরের রাস্তাটির ওপর।
বিশেষ করে পরীক্ষা চলাকালে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তখন নিরাপত্তার স্বার্থে ১৪৪ ধারা বা চলাচলে বিধিনিষেধ থাকলে দর্শনার্থী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি বাড়ে। অন্যদিকে কলেজের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পর কলেজের মাঝখানের রাস্তা নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে মতভেদেরও সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে কলেজ চলাকালে রাস্তা বন্ধ রাখা হয় এবং কলেজ ছুটির পর, শুক্রবার-শনিবারসহ অন্যান্য ছুটির দিনে তা খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এতেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। রাস্তা বন্ধ থাকলে বাইরে থেকে আসা দর্শনার্থীরা সমস্যায় পড়েন, ক্ষতিগ্রস্ত হন ব্যবসায়ীরা। আবার অনেক সময় বাধ্য হয়েই মানুষ কলেজের ভেতর দিয়ে চলাচল করেন।
এ ছাড়া কলেজের মূল ফটকের সামনে মোটরসাইকেল রেখে যাওয়ার সুযোগ থাকায় একাধিক মোটরসাইকেল চুরির ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে কলেজ, শিশুপার্ক, রাজধলা মুক্তমঞ্চ, বিলপাড়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং দর্শনার্থী-সব পক্ষই কোনো না কোনোভাবে এই রাস্তা-সংকটের কারণে সমস্যায় পড়ছেন।
শিশু পার্ক নির্মাণ ও জমি নিয়ে প্রশ্ন:
এদিকে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত উপজেলা প্রশাসন শিশুপার্ক নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শিশুপার্ক নির্মাণে কলেজের জমি ব্যবহার করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও আলোচনা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় নিউজ পোর্টাল ‘পূর্বধলার দর্পণ’ গত ১৮ সেপ্টেম্বর একটি মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন নথি ও তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, উপজেলা প্রশাসন কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই সরকারি জায়গায় শিশুপার্ক নির্মাণ করেছে। একই সঙ্গে কলেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ১ নম্বর খতিয়ানের ৫৩ শতাংশ জমি দখলে রাখার অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসে। এ বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি আদালতে মামলা করেছে বলেও জানা গেছে।
অন্যদিকে হালটের রাস্তার ওপর কলেজের মূল ফটক নির্মাণের বিষয়টিও প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এখতিয়ারসংক্রান্ত প্রশ্ন তুলেছেন। এসব বিষয় নিয়ে যে অস্পষ্টতা ও মতভেদ তৈরি হয়েছে, তার একটি স্থায়ী ও আইনসম্মত সমাধান হওয়া জরুরি।
সমাধান হতে পারে বিকল্প সড়ক:
পূর্বধলা সরকারি কলেজ যেমন এলাকাবাসীর আবেগ ও গর্বের প্রতিষ্ঠান, তেমনি পাশের ঐতিহ্যবাহী রাজধলা বিল, বিলসংলগ্ন ঘাট, শিশুপার্ক ও রাজধলা মুক্তমঞ্চও পূর্বধলাবাসীর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অন্য স্থাপনাগুলো বন্ধ করে দেওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
বরং প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কলেজের মাঝখান দিয়ে জনসাধারণের নিয়মিত চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে কলেজের পূর্ব পাশের সীমানা ঘেঁষে একটি স্বতন্ত্র রাস্তা নির্মাণ করা যেতে পারে। কলেজের মূল ফটক থেকে বিলপাড় পর্যন্ত এই রাস্তা নির্মাণের পাশাপাশি কলেজের অংশে প্রায় চার ফুট উঁচু দেয়ালের ওপর গ্রিল দিয়ে সীমানা তৈরি করা যেতে পারে।
বিশেষ প্রয়োজনে কলেজ কর্তৃপক্ষের বিলপাড়ে যাতায়াতের জন্য একটি পৃথক ‘পকেট গেট’ রাখা যেতে পারে। এতে দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি হবে, একই সঙ্গে কলেজের মূল শিক্ষাঙ্গনও আলাদা থাকবে।
তবে শুধু পূর্ব পাশের সীমানা নির্ধারণ করলেই কলেজের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। কলেজের মূল গেটের উত্তর পাশ থেকে মসজিদের পেছনের দেয়াল পর্যন্ত হালটের রাস্তা বাইরে রেখে আরও একটি সীমানা তৈরি করা প্রয়োজন। সেখানে প্রায় চার ফুট উঁচু সেমি-ওয়ালের ওপর গ্রিল বসানো যেতে পারে। মাঝখানে কলেজের জন্য একটি পৃথক গেট এবং মুসল্লিদের চলাচলের সুবিধার্থে মসজিদের পাশে একটি পকেট গেট রাখা যেতে পারে।
প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ:
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কলেজ কর্তৃপক্ষ, উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিকল্প সড়ক, সীমানাপ্রাচীর, গেট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা যেতে পারে।
সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে জমির মালিকানা, রাস্তার বৈধতা, সীমানা এবং ব্যবহারের অধিকারও স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ ভবিষ্যতে নতুন কোনো বিরোধ তৈরি না করে স্থায়ী সমাধান করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে পূর্বধলা সরকারি কলেজ চারদিকে সীমানাপ্রাচীরের মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত শিক্ষাঙ্গনে পরিণত হতে পারে। কলেজের মাঝখান দিয়ে জনসাধারণের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল বন্ধ হবে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বাড়বে এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশও আরও সুন্দর হবে।
রাজধলা বিল, শিশুপার্ক ও মুক্তমঞ্চও চালু থাকবে; একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের জন্য তৈরি হবে বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা। অর্থাৎ কোনো পক্ষকে বঞ্চিত না করে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
পূর্বধলা সরকারি কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও এলাকার মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতিষ্ঠান। তাই কলেজের নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ এবং রাজধলা বিলকেন্দ্রিক পর্যটন ও বিনোদন-সবকিছুর সমন্বয় করেই এখন একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
মো: জায়েজুল ইসলাম







