মায়ের কাছেই রাজনীতির দীক্ষা নেন পুত্র তারেক
আরবান ডেস্ক
প্রকাশ : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:১৮ দুপুর

১৯৮১ সালের ৩০ মে। দেশের আকাশে এক মহাদুর্যোগ নেমে আসে। কতিপয় বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেন। এরপর ১৯৮২ সালে দলের প্রাথমিক সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া। তার রাজনীতিতে প্রবেশের মধ্য দিয়েই নতুন বিএনপি তার পথচলা শুরু করে। কিন্তু তিনি একা রাজনীতি করেননি। দুই পুত্রকেও রাজনীতির শিক্ষা দিতে থাকেন বেগম জিয়া। গত চার দশক খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোয় তারেকের সরব উপস্থিতি এবং দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই তার প্রমাণ মেলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, খালেদা জিয়া তার জ্যৈষ্ঠপুত্র তারেক রহমানকে দেশের রাজনীতির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করতে পেরেছেন। দেশের জন্য অনেক অবদান ও সফলতার মধ্যে তারেককে তৈরি করতে পারা খালেদা জিয়ার অন্যতম সেরা অর্জন। তার অনুপস্থিতিতে দলকে এগিয়ে নিয়ে ক্ষমতার কাছাকাছি এনেছেন তারেক রহমান। খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও দেশপ্রেম তারেকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। মূলত খালেদা জিয়ার কাছ থেকে রাজনীতির যে শিক্ষা তারেক নিয়েছেন, তা তাকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখবে।
বিএনপির গত চার দশকের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া রাজনীতিতে নেমে স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে রাজপথে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। মায়ের সঙ্গে সেসব আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তারেক রহমান। ১৯৮৬ সালে এরশাদের পতন যখন ঘনিয়ে আসছিল তখন মায়ের সঙ্গেই গৃহবন্দি হন তারেক। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্যেই ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হয়ে রাজনীতিতে অভিষেক হয় তারেক রহমানের। এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মায়ের সঙ্গে উপস্থিত থেকে দেশের প্রতিটি জেলায় নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন তারেক রহমান। খালেদা জিয়ার ক্যারিশম্যাটিক সেই প্রচারণায় ভোটে জিতে সরকার গঠন করে বিএনপি। আর খালেদা জিয়া হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।
১৯৯৩ সালে রাজনীতিতে প্রজ্ঞার পরিচয় দেন তারেক রহমান। তিনি বগুড়া জেলা বিএনপির নেতৃত্ব নির্বাচন করেন গোপন ভোটের মাধ্যমে। তার দূরদর্শিতা বিবেচনায় নিয়ে ২০০২ সালে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি তাকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত করে। ২০০৯ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন। ২০১৮ সালে তার মা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠালে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, মূলত মা খালেদা জিয়ার কাছ থেকেই রাজনীতির খুঁটিনাটি শিখতে থাকেন তারেক রহমান। ধৈর্য আর সহনশীলতার সব শিক্ষাই পেয়েছেন মায়ের কাছে। ফলে দীর্ঘ ১৭টি বছর বিদেশে নির্বাসনে থাকলেও হাল ছেড়ে দেননি তারেক রহমান। সুদূর লন্ডন থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দল টিকিয়ে রাখেন তিনি। দেড় দশকের বেশি সময় পর গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরলেন তিনি। কিন্তু যার হাত ধরে রাজনীতিতে আসা এবং যার কাছে রাজনীতির দীক্ষা নিয়েছেন সেই মমতাময়ী মা খালেদা জিয়াকে নিয়ে আর রাজনীতির মাঠ চষে বেড়াতে পারলেন না তারেক রহমান। পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
নিজের রাজনৈতিক শিক্ষক মাকে হারিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লিখেছেন, ‘আমার মা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সর্বশক্তিমান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আজ (গতকাল) আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন দেশনেত্রী, আপসহীন নেত্রী; অনেকের কাছে গণতন্ত্রের মা, বাংলাদেশের মা। আজ দেশ গভীরভাবে শোকাহত এমন একজন পথপ্রদর্শককে হারিয়ে, যিনি দেশের গণতান্ত্রিক পথযাত্রায় অনিঃশেষ ভূমিকা রেখেছেন।’
তারেক রহমান আরও লেখেন, ‘আমার কাছে খালেদা জিয়া একজন মমতাময়ী মা, যিনি নিজের সমগ্র জীবন উৎসর্গ করেছেন দেশ ও মানুষের জন্য। আজীবন লড়েছেন স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে; নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। ত্যাগ ও সংগ্রামে ভাস্বর হয়েও তিনি ছিলেন পরিবারের সত্যিকারের অভিভাবক; এমন একজন আলোকবর্তিকা যার অপরিসীম ভালোবাসা আমাদের সবচেয়ে কঠিন সময়েও শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, সর্বোচ্চ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তবুও যন্ত্রণা, একাকিত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও তিনি অদম্য সাহস, সহানুভূতি ও দেশপ্রেম সঞ্চার করেছিলেন পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মাঝে।’
তারেক বলেন, ‘দেশের জন্য তিনি হারিয়েছেন স্বামী, হারিয়েছেন সন্তান। তাই এই দেশ, এই দেশের মানুষই ছিল তার পরিবার, তার সত্তা, তার অস্তিত্ব। তিনি রেখে গেছেন জনসেবা, ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিক্রমায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আপনারা সবাই আমার মার জন্য দোয়া করবেন। তার প্রতি দেশবাসীর আবেগ, ভালোবাসা ও বৈশ্বিক শ্রদ্ধায় আমি ও আমার পরিবার চিরকৃতজ্ঞ।’






