সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৪ বৈশাখ ১৪৩৩
শিরোনাম

শেরপুরে বিলুপ্তপ্রায় পাখ-পাখালির আবাসস্থল গড়ে উঠেছে বালিঝুড়ি রেঞ্জ অফিস


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ২৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:২৪ বিকাল

শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকার বন বিভাগের বালিঝুড়ি রেঞ্জ অফিস যেন দেশের বিলুপ্তপ্রায় পাখ-পাখালির আবাসস্থল গড়ে উঠেছে। দুই থেকে তিন বছর আগেও এই রেঞ্জ অফিস এবং আশপাশের বনাঞ্চলে যেসব পাখি দেখা মিলেনি বর্তমানে রেঞ্জ অফিসের ভেতর শত বছরের পুরনো বিভিন্ন গাছ-গাছালি আর সবুজ প্রকৃতির মধ্যে বিলুপ্তপ্রায় পাখপাখালীর ছোটাছুটি ও কিচিরমিচির শব্দে প্রকৃতি যেন প্রাণ খুঁজে পেয়েছে। 

রেঞ্জ অফিসের শত বর্ষীয় আম, সেগুন, মেহগনি, কড়ই, বিরল প্রজাতির হলদু গাছ সহ বিভিন্ন ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের ডালে ডালে ছুটে বেড়াচ্ছে বিলুপ্ত প্রায় কাঠ বিড়ালি, টিয়া, ঘুঘু, পেঁচা, বুলবুলি, নীলকান্ত, বাবুই, চড়ুই, শালিক, বসন্ত বৌরি, কাঠ ঠোকরা, বউ কথা কও, ফিঙ্গেসহ নানান প্রজাতির পাখ-পাখালি। 

রেঞ্জ অফিস চত্বর জুড়ে নির্মল সবুজ প্রকৃতির মাঝে বাড়তি সৌন্দর্য ও মনকে দোলা দেয়ার জন্য গোলাপ, হাসনাহেনা, গাঁদা, জবা, বেলি, রজনীগন্ধা, শিউলি, কামিনী, গন্ধরাজ, অপরাজিতা, করবী, টগর, কাঠগোলাপ, চাঁপাসহ অর্ধশত দেশীয় এবং বিভিন্ন পাহাড়ি ফুলের সমারহ।

রেঞ্জ অফিস চত্বর এবং আশপাশের সীমান্ত সড়কে চলাচলরত মানুষের মনে পাখিদের কলতানের আনন্দ দেয়, প্রাণে আবেদন সৃষ্টি করে সৃজনশীলতার ভাবনায় সুরেলা কণ্ঠের মোহ মায়ায়। বৈচিত্র্যময় পাখির বিচরণ, যা আমাদের চারপাশের মনোমুগ্ধকর পরিবেশে বৈচিত্র্য আনে। এই অফিস চত্বরের বাংলোর বারান্দায় বসে নির্ভীঘ্নে দিন পার হবে যাবে পাখির কলতান আর ছোটা ছুটির দৃশ্য দেখে। কারণ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে পাখিদের এই কলতান আর ছোটাছুটি। 

মূলত বাংলাদেশ পাখ পাখালি আর বন্যপ্রাণীর কারণেই এত শৈল্পিক, কাব্যিক, সতেজ ও প্রাণবন্ত। তাই ক্ষণিকের জন্য হলেও রেঞ্জ অফিস চত্বরে প্রকৃতির নির্মল গাছের ছায়ায় বসে থাকলে মনের যত কষ্টকে ভুলিয়ে দিবে। দিন ব্যাপী  পাখপাখালির কলরব আর ছোটাছুটির দৃশ্য মনকে মোহিত করার পাশাপাশি সৃষ্টি জগতের প্রতি গভীর ভালোবাসা তৈরি হবে। তৈরি হবে প্রকৃতির প্রতি প্রেম। এখানে একবার এসে ঘুরে গেলে সে পরিবার বা ঘরের নানা কর্মের ব্যস্ততার ফাঁকে শান্তির পরশ পেতে আবারো ছুটে আসতে হবে এই রেঞ্জ অফিসে।

এই অফিস চত্বর ছাড়াও আশপাশের বেশ কয়েকটি পাহাড়ে একই দৃশ্য দেখা গেছে। অবাধ বিচরণ শুধু পাক-পাখালি নয়, রয়েছে আরো ফড়িং, প্রজাপতি সহ বিভিন্ন কিট-পতঙ্গেরও। 

শেরপুর বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং প্রকৃতি ও পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ হিউম্যানিটি, ইন্টারাপ্টেড নের্চা এন্ড এনভাইরন্মেন্ট্ (শাইন্) -এর নির্বাহী পরিচালক মো. মুগনিউর রহমান মনি জানান, আমাদের এই গারো পাহাড় এখনও বৃক্ষরাজি, প্রাণী ও পাখি সমৃদ্ধ বনাঞ্চল। বালিজুরি অফিস পাড়া, খৃষ্টানপাড়া, খাড়ামুরা, মালাকুচা, হারিয়াকোনা, বাবেলাকোনাসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলে হাতি, বনবিড়াল, বনরুই, শিয়াল, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, গুইসাপ, তক্ষক ছাড়াও বিভিন্ন প্রাণী ও বিরল প্রজাতির পাখির দেখা মিলেছে। পাখির মধ্যে লাল বন মুরগি, মথুরা, পাতি সরালি, উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস, পাতি তিলিহাঁস, গোলা পায়রা, উদয়ী রাজঘুঘু, ইউরেশীয় কন্ঠীঘুঘু, তিলা-ঘুঘু, ঠোঁটমোটা হরিয়াল, হলদেপা হরিয়াল, খয়রা গুরগুরি, প্যাঁচা, বক, ফিঙ্গে, পাপিয়া, তিলা নাগঈগল, পাহাড়ি শিকরেঈগল, বহুরূপী শিকরেঈগল, উদয়ী মধুবাজসহ শতাধিক প্রজাতির পাখি রয়েছে। পাখি ও প্রণীর নিরাপদ বিচরণ এবং প্রজননের জন্য তাদের বান্ধব বন বৃদ্ধি করতে হবে। এছাড়াও শিকার ও ডিস্টার্ব না করা। সর্বোপরি প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশের সুরক্ষায় সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বনবিভাগসহ সবাই মিলে একসাথে কাজ করতে হবে।  

বালিজুরি রেঞ্জ অফিসের রেঞ্জার সুমন মিয়া বলেন, প্রকৃতির নির্মল ছায়া এবং পাখপাখালীর অবাধ বিচরণ শুধু এই রেঞ্জ অফিসসেই নয়, আমার এই রেঞ্জ এলাকায় প্রায় ৮ হাজার একর জমিতে বনজ গাছের পাশাপাশি প্রচুর মিশ্র ফল ও ওষুধি গাছের বাগান রয়েছে। যে কারণে এই এলাকায় কিছুদিন যাবত তৈরি হয়েছে পাখপাখালীসহ নানা জীববৈচিত্রের সমাহার। আমার এই রেঞ্জ অফিসটি পাহাড়ি টিলার উপর প্রায় পাঁচ একর জমিতে স্থাপন করা হয়েছিল অনেক আগে। এই অফিসে এখনো ব্রিটিশ সময়কালের মূল ভবনের চিহ্ন রয়েছে। সেই সাথে এখানে রয়েছে শতবর্ষীয় অসংখ্য গাছ। আর এইসব গাছ এবং পরবর্তীতে আরো বিলুপ্তপ্রায় অসংখ্য গাছের চারা রোপন করার পর সম্প্রতি পাখপাখালী সহ বিভিন্ন প্রাণীর আশ্রয়স্থল হয়েছে। আমি এখানে আসার পর অফিস চত্বরে আমি নিজে প্রায় অর্ধশত প্রজাতির দেশী-বিদেশি প্রজাতির ফুল গাছ রোপন করেছি। যে কারণে এখানে পাখ-পাখালি ছাড়াও মৌমাছিসহ প্রজাপতি ও ফড়িং এর বিচরণ বেড়েছে। রাতের বেলা বিলুপ্তপ্রায় পেঁচা সহ বিভিন্ন অদ্ভুত পশু পাখির ডাক শোনা যায়। এতে বোঝা যায় এই এলাকায় জীববৈচিত্র্যের কোন ঘাটতি নেই।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত