শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩
শিরোনাম

সীমান্ত জেলা শেরপুর হতে পারে দেশের অন্যতম‌ অর্থনীতির চালিকা শক্তি


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৯ রাত

উত্তরবঙ্গ সংযোগ ও দক্ষিণ এশীয় বাণিজ্যের নতুন প্রবেশদ্বার শেরপুর কেবল একটি সীমান্তবর্তী জেলা নয়, এটি হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির আগামীর অন্যতম চালিকাশক্তি।

জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেষা গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ছোট এই শেরপুর জেলা। ভৌগোলিক আয়তনে ছোট হলেও বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের নতুন সমীকরণে শেরপুর জেলা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার দাবি রাখে। 

বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের গাইবান্ধা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারীর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়ের সাথে রাজধানীর দূরত্ব ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার কমিয়ে আনা এবং নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) সাথে সংযোগ স্থাপনে শেরপুর হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

বর্তমানে ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের যাতায়াতের জন্য যমুনা সেতুর ওপর নির্ভর করতে হয়। এর ফলে আশুলিয়া, নবীনগর, শফিপুর এবং টাঙ্গাইল থেকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল পর্যন্ত যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র যানজটে আটকে থাকতে হয়।

দ্বিতীয় যমুনা সেতু (জামালপুর-গাইবান্ধা) অথবা চিলমারী-রৌমারী সেতু নির্মাণ হলে এবং শেরপুর-ময়মনসিংহ ফোর লেন রুট ও শম্ভুগঞ্জ নতুন নির্মানাধীন ৬ লেনের আর্চ ব্রীজটি চালু হলে এই ভয়াবহ যানজট থেকে মুক্তি মিলবে। এটি যমুনা সেতুর বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করবে, যা সাভার শিল্পাঞ্চলের পণ্য পরিবহন সহজতর করবে এবং যাত্রীদের সময় ও জ্বালানি সাশ্রয় নিশ্চিত করবে।

কুড়িগ্রাম জেলার ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন দুটি উপজেলা হলো রৌমারী ও রাজীবপুর। ভৌগোলিকভাবে কুড়িগ্রামের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে এই দুটি অঞ্চলের মানুষ যাতায়াতের জন্য চিরকালই শেরপুর ও জামালপুরের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে এই দুই উপজেলার বাসিন্দারা মূলত শেরপুর হয়েই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করে। প্রস্তাবিত সেতু ও উন্নত সড়ক ব্যবস্থা এই যাতায়াতকে আরও দ্রুত ও সহজ করবে।

শেরপুর জেলা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। এই রুট ও রেলপথ চালু হলে শেরপুরের বিখ্যাত কাঁকর মেশানো লাল মোটা বালি, গারো পাহাড়ের ছোট পাথর এবং চীনামাটির পরিবহন সহজ হবে।

এছাড়া শেরপুরের উদ্বৃত্ত ধান ও চাল দ্রুততম সময়ে সারা দেশে পৌঁছানো সম্ভব হবে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে নির্মাণ সামগ্রীর পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, যার সরাসরি সুফল পাবে দেশের সাধারণ মানুষ ও নির্মাণ খাত।

সরকার ইতোমধ্যে জামালপুর হতে শেরপুর হয়ে নাকুগাঁও স্থলবন্দর এবং রৌমারী পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। রেলওয়ের মাস্টারপ্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও কৌশলগত নকশা তৈরির কাজ বর্তমানে অগ্রগতির পথে। এই রেলপথটি চালু হলে নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে আসা ভারতীয় পাথর, কয়লা এবং নেপাল-ভুটানের পণ্য সবচেয়ে কম খরচে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। এতে শেরপুর হবে আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার (নেপাল-ভুটান ও ভারত)। অর্থাৎ শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দর বিবিআইএন (BBIN) চুক্তির আওতায় দক্ষিণ এশীয় বাণিজ্যের অন্যতম প্রবেশদ্বার। ভুটান ও নেপাল তাদের পণ্য আমদানিতে এই রুটটি ব্যবহারের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী। ভবিষ্যতে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা চালু হলে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যের (সেভেন সিস্টার্স) সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবে শেরপুর নেতৃত্ব দেবে। 

ইতিমধ্যে গত পাঁচ বছরের মধ্যে বেশ কয়েকবার ভুটান ও নেপালের মন্ত্রী পর্যায়ের কর্মকর্তারা শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দরকে ব্যবহার করে দেশের গার্মেন্টস পণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি ও তাদের দেশের পন্য রপ্তানিতে আগ্রহ প্রকাশ করে এই বন্দর পরিদর্শন করেছেন। দেশের অন্য স্থলবন্দর দিয়ে নেপাল ও ভুটানের পণ্য ঢাকায় পৌঁছাতে যে সময় প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক কম সময়ে শেরপুরের নাকুগাঁও স্থলবন্দর দিয়ে ঢাকায় পৌঁছানো সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে ভারতের পক্ষ থেকে করিডোর অথবা ট্রানজিট দেয়ার উপর নির্ভর করবে।

শেরপুর এখন আর কেবল একটি অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া সীমান্ত জেলা নয়, বরং এটি উত্তরবঙ্গ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য ‘কানেক্টিভিটি হাব’। সম্ভাব্য দ্বিতীয় যমুনা সেতু অথবা চিলমারী-রৌমারী সেতু, রৌমারী-রাজীবপুরের মানুষের সরাসরি সংযোগ এবং জামালপুর-শেরপুর-নাকুগাঁও রেলপথ বাস্তবায়িত হলে শেরপুর জেলা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নের এক নতুন ইতিহাস রচনা করবে এমনটি আশা করছে শেরপুরের সর্বস্তরের জনগণ এবং সচেতন মহল। 

এ বিষয়ে শেরপুর চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি এর সভাপতি আরিফ হোসেন জানায়, সীমান্ত জেলা শেরপুরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাকুগাঁও স্থলবন্দর ও ইমিগ্রেশন পয়েন্টটির সাথে দেশের রাজধানী ঢাকা এবং ভারতের সেভেন সিস্টার সহ নেপাল ও ভুটানের সহজ সড়ক যোগাযোগ মাধ্যম রয়েছে। এ স্থলবন্দরের উন্নয়নের পাশাপাশি রেল সংযোগ এবং প্রস্তাবিত সিলেট-সুনামগঞ্জ-শেরপুর-রৌমারী-কুড়িগ্রাম সড়ক উন্নয়নের পাশাপাশি জামালপুর-গাইবান্ধা দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ হলে উত্তরের আটটি জেলা সহ ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের আরো আটটি জেলা সহ দেশের উত্তরের ১৬ জেলার সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটবে। সেক্ষেত্রে সীমান্ত জেলা শেরপুর দেশের অন্যতম বাণিজ্যিক পয়েন্ট সৃষ্টি হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আমাদের শেরপুরের ব্যবসায়ীদের দাবি উল্লেখিত উন্নয়ন প্রকল্প যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করা অতি জরুরী।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত