টাইপিস্টিক থেকে সহকারী পরিচালক রুস্তম আলী দুর্নীতির টাকায় হয়েছে কোটিপতি
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:২৫ দুপুর
_original_1786778720.jpg)
১১ আগস্ট মধ্যরাতে শেরপুরের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সহকারী পরিচালক রুস্তম আলীর নারী কেলেঙ্কারি ঘটনার পর ইতিপূর্বে তার নানা অপকর্মের তথ্য ফাঁস হচ্ছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) সারাদিন থানা হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের পর বিকেলে পাসপোর্ট অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জিম্মায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
এঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. নুরুল হাফিজ।
এদিকে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে টাইপিস্ট পদে চাকুরীতে যোগদান করে বর্তমানে হয়েছেন পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক (এডি)। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এর আগেই দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে কোটিপতি বনে গেছেন এই শেরপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক রুস্তম আলী।
সূত্র জানায়, রুস্তম আলী দিনাজপুরের কসবা এলাকার জিন্নাত আলীর ছেলে। বর্তমানে শেরপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে কর্মরত। তার আগের কর্মস্থল ছিল ঢাকার উত্তরায়। আত্মীয়স্বজন ও অফিসের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ রুস্তম আলী ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকা উপার্জন করেছেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি তিনটি বিয়ে করেছেন বলে তার প্রথম স্ত্রী আসমা খাতুন সূত্রে জানা গেছে।
জানা যায়, ১৯৯১ সালে পাসপোর্ট অফিসের টাইপিস্ট পদে যোগদান করেন রুস্তম আলী। প্রথম স্ত্রী আসমা খাতুনের দুলাভাই রফিকুল ইসলাম পাসপোর্ট অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ায় তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তার মাধ্যমেই দুর্নীতির হাতে খড়ি রুস্তম আলীর। দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের পদোন্নতিসহ শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া রস্তম আলী বিয়ে করেছেন তিনটি। দেশের যে প্রান্তেই গেছেন সেখানেই পাসপোর্ট বাণিজ্যের জমজমাট ব্যবসা খুলেছেন। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ এবং কুষ্টিয়ায় অন্তত ২০০টি পাসপোর্ট চুরি করে ভারতের পাসপোর্ট জালিয়াতি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেন। সে সময়ে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হয়। কিন্তু তদন্তটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, রুস্তম আলী নামে-বেনামে ঢাকা, দিনাজপুর, কুমিল্লা ও কুষ্টিয়ায় শত কোটি টাকার সম্পদ গড়ে তুলেছেন। ইতিমধ্যেই তিনি দিনাজপুরের কাঞ্চন ব্রিজের কাছে পাঁচতলা ইমারত ও দিনাজপুরের বালিয়াডাঙ্গায় কিনেছেন বাড়ি।
তা ছাড়া ঢাকার উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোড ও ১২ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডে দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। রুস্তম আলীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৭ সাল, ২০১২ সাল এবং ২০১৩ সালে বিভাগীয় তদন্ত হয়। কিন্তু একটি তদন্তও আলোর মুখ দেখেনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রুস্তম আলী তার বিভিন্ন ব্যাংকে জমা করা টাকার একটা বিরাট অংশ উত্তোলন করেছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এর পরে তাকে শেরপুরে বদলি করা হয়।
শেরপুরে যোগদান করার পরেও তার বিরুদ্ধে ঘুস গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। শেরপুর শহরের রঘুনাথ বাজার মহল্লার কবির হোসেন নামে এক ব্যক্তি জানায়, গত জানুয়ারিতে তার এক আত্মীয়ের পাসপোর্ট করতে এসে ওই পাসপোর্টে নামের বানান ভুল দেখিয়ে ১২ শত টাকা নিয়েছিল এই রুস্তম আলী। এছাড়া পাসপোর্ট অফিসের বেশ কিছু কম্পিউটার দোকানের মালিকদের সাথে তার রয়েছে গোপন চুক্তি। ছোটখাটো ভুল ত্রুটি ইচ্ছে করেই ওইসব দোকানদার করে দেয়। পরবর্তীতে ওই ভুল সংশোধনের নামে নেয়া হয় ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
শহরের মধ্যসেরী মহল্লার মমিন নামে এক ব্যক্তি জানায়, তার বড় ভাই আমেরিকান পাসপোর্টধারী। তার স্ত্রী পাসপোর্ট করতে আসলে আমেরিকায় প্রবাসী ভাইয়ের পাসপোর্ট দেখাতে বলে, ওই পাসপোর্ট দেখাতে না পাড়ায় তার কাছ থেকে অফিসের এক পিয়নের মাধ্যমে রুস্তম আলী ৫ হাজার টাকা ঘুস গ্রহণ করে বলে জানান তিনি।
রুস্তম আলীর প্রথম স্ত্রী আসমা খাতুন বলেন, 'আমি তাকে টাকা-পয়সা দিয়ে ডিগ্রি পাস করিয়েছে। একের পর এক নারী কেলেংকারী এবং অবৈধভাবে টাকা উপার্জনে বাধা দেওয়ায় তার সঙ্গে আমার বনিবনা হচ্ছিল না। পরে আমি তাকে ডিভোর্স দেই। সে খুব খারাপ প্রকৃতির লোক। আমার দুলাভাই রফিকুল ইসলাম এবং রুস্তম আলী দুজনে মিলেই এসব অপকর্ম করে কোন সরকারের কাছে আমার দাবি, রুস্তমের যেন কঠিন বিচার করা হয়।'
এই রুস্তম আলী শেরপুরে যোগদান করার পর তার নানা অপকর্মের বিষয়ে ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই খবরে বলা হয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন এই এডি। তিনি বনানীতে চাকরি করার সময় দূই শতাধিক ভারতীয় নাগরিকের অবৈধ পাসপোর্ট করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. নুরুল হাফিজ বলেন, তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপাতত তাকে মুচলেকা দিয়ে শেরপুর থানা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।

_medium_1786781542.jpg)
_medium_1786781002.jpg)
_medium_1786780830.jpg)

_medium_1786780514.jpg)
_medium_1786780275.jpg)
