শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম

ছন্দ হারাচ্ছে গারো পাহাড়ের ছড়া


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ০৯ জুলাই ২০২৬, ১১:২৬ দুপুর

উঁচু উঁচু গারো পাহাড়ের টিলার কোল ঘেষে আঁকাবাঁকা হয়ে ছুটে চলা ছড়া বা ঝরনার কলতানে বা ছন্দে একসময় মুখরতে ছিল শেরপুরের গারো পাহাড়। কিন্তু বর্তমানে ছন্দ যেন হারিয়ে ফেলেছে ছড়াগুলো।

শেরপুর জেলার গারো পাহাড়ের আনাচে কানাচে ঝোপঝাড় ও জঙ্গল দিয়ে প্রবাহিত ঝরনা, ছড়া এবং ঝিরিগুলো এখন আর চোখেই পড়েনা। জলবায়ু পরিবর্তন এবং মানব সৃষ্ট অবৈধ ভাবে বালু ও পাথরের উত্তোলন এবং বনের বৃক্ষ কর্তনের মাধ্যমে পরিবেশ ধ্বংসের কারণে ছড়াগুলো এখন শুকনো কঙ্কাল সার হয়ে পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। ছড়াগুলোর অস্তিত্ব কেবল বর্ষার সময় কিছুটা চোখে পড়ে। বর্ষার সময় পানি না থাকায় সেটা চারণভূমি হয়ে পড়ে থাকে।

ইতোপূর্বে এসব ছড়া পরিবেশ সুরক্ষায় বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছিল। ধারণা করা হচ্ছে, বিগত প্রায় ৫০ বছর আগেও গারো পাহাড় ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিস্তীর্ন পাহাড়ি এলাকাজুড়ে ছিল শত শত ঝরনা, ছড়া এবং ঝিরির প্রবাহ। 

এসব ঝরনা, ছড়া এবং ঝিরি দিয়ে পানির ধারা বহমান থাকত এবং মানুষ, বনের ‌পশু-পাখি ও জীবজন্তু এই পানির ধারা থেকে তৃষ্ণা মেটাত। একই সাথে স্থানীয় বাসিন্দারা ছড়া থেকে তৃষ্ণা মেটাতে পানি পান ছাড়াও গৃহস্থলী কাজে ব্যবহার করতেন ।

বিপুল সংখ্যক ঝর্ণা, ছড়া এবং ঝিরি থাকায় মাত্র ৫০ বছর আগেও গারো পাহাড় জুড়ে ছিল হরেক রকম গাছপালা ও প্রাণীবৈচিত্র। ছড়াগুলোতে বছর জুড়ে পানি থাকায় সেখানে নানা প্রজাতি মাছ পাওয়া যেতো এক সময়।‌কিন্তু এখন এসব ঝরনা, ছড়া এবং ঝিরির সংখ্যা প্রায় শূণ্যের কোটায় নেমে এসেছে। 

এসব ছড়ার মধ্যে গজনী বিট এলাকায় রয়েছে ১৮ ছড়া ঝর্ণা, অর্থাৎ ভারতের মেঘালয় রাজ্য সীমান্ত থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত সড়ক পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এর মধ্যে এই ছড়াটি ১৮ বার বাঁক নিয়েছে, যে কারণে স্থানীয়রা এটার নাম দিয়েছে ১৮ ছড়া। অপরদিকে নালিতাবাড়ী উপজেলার সমেশ্বচূড়া পাহাড়ি এলাকায় রঞ্জনা ঝর্ণা নামে একটি ছড়া রয়েছে। স্থানীয়রা জানায়, প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বছর আগে এই এলাকায় এক নৃ-গোষ্ঠী গারো সম্প্রদায়ের রঞ্জনা নামে এক ছোট্ট শিশু এই ছড়ার পানিতে ডুবে মারা যায়। সেই থেকে এই ছাড়ার নামকরণ করা হয় রঞ্জনা ঝরনা।

ঝিনাইগাতী গারো পাহাড়ের শতবর্ষী ডা: আব্দুল বারী ও আলহাজ্ব শরীফ উদ্দিন সরকার বলেন, ইতোপূর্বে গারো পাহাড়ের এসব ঝরনা, ছড়া ও ঝিরিতে পাহাড়ি মানুষ, পশু পাখি এবং জীবজন্তু- জানোয়ারের বসবাস ছিল। বর্তমানে সামান্য যেসব ছড়া অবশিষ্ট আছে সেগুলোর মধ্যে কিছু বারোমাসি এবং অনেকগুলো মৌসুমী ছড়া। বারোমাসী ছড়ায় সবসময় কমবেশি পানির ধারা প্রবাহ থাকলেও মৌসুমি ছড়ায় বিশেষ বিশেষ সময় বিশেষ করে বর্ষার সময় পানির দেখা মেলে। 

হালচাটি গ্রামের কনেশর কোচ বলেন, আমি ছোট থেকে যে নদী, ছড়া, নলা, ঝরনা দেখে আসছি, তা আগের মতো নেই। দিন দিন নানা কারনে এগুলো কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে নদী-ছড়া-ঝরনা থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদী ও ছড়ার স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে।

গারো পাহাড়ে সবগুলো ছড়াকে বারোমাসি ছড়ায় পরিণত করতে নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা, অধিক হারে বাঁশের ঝোপ রোপণ, ছড়া থেকে পাথর-বালু উত্তেলান বন্ধ করা,‌ পাহাড়ি ছড়ার ৪০-৫০ ফুট এলাকার মধ্যে কোনো ধরনের চাষাবাদ না করা, পরিকল্পিত বনায়ন করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া জরুরী বলে তাঁরা মনে করেন। 

শেরপুর বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং প্রকৃতি ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘শাইন্’ -এর নির্বাহী পরিচালক মো. মুগনিউর রহমান মনি জানান, জেলার সীমান্তবর্তী শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলার গারো পাহাড়ি এলাকায় নদী ও  পাহাড়ি ছড়া ছিল প্রায় অর্ধশতের মতো। এ নদী ও ছড়াগুলি অত্রাঞ্চলের প্রতিবেশ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। কিন্তু গারো পাহাড়ে নির্বিচারে ও অপরিকল্পিতভাবে বালু,  পাথর উত্তোলন এবং গাছ কাটার ফলে গারো পাহাড়ের নদী ও অনেক ছড়া আজ মরে গেছে। ফলে এর সংশ্লিষ্ট বিশাল এলাকার প্রতিবেশ ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রকৃতিকে তার নিজের নিয়মে চলতে না দিলে মানুষ ও পশু-পাখিসহ  কেউই এই ক্ষতির হাত থেকে  রেহাই পাবে না। তাই এখনই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারি, গণ সচেতনতা তৈরিসহ কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, মোঃ আল আমীন বলেন, পাহাড়ে বন উজাড় এবং বিভিন্ন ছড়া ও নদী থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন ঠেকাতে বন বিভাগের পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। আমি মনে করি, এসবের পাশাপাশি স্থানীয়দের বিশেষ করে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে এসে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সর্বস্তরে পাহাড় ও বন রক্ষায় সচেতনতা তৈরি না হলে প্রশাসনের একার পক্ষে এসব রক্ষা করা যাবে না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত