মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শিরোনাম

শেরপুরের সড়কে ‘চলন্ত বোমা’-তদারকিহীন সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঝুঁকিতে লাখো যাত্রী


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ০৮ জুন ২০২৬, ০১:০২ দুপুর

সিএনজি চালিত থ্রি-হুইলারের গ্যাস সিলিন্ডার এখন সাধারণ যাত্রীদের জন্য এক নীরব আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর সরকারি তদারকির অভাবে এসব সিলিন্ডার অনেক ক্ষেত্রেই যেন “চলন্ত বোমা” হয়ে সড়কে ছুটে চলেছে। 

সরকারি আইন ও গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালা-২০০৩ এর ২৭ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি সিএনজি সিলিন্ডার তিন বছর পরপর পুনঃপরীক্ষা বা রি-টেস্টিং বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ থ্রি-হুইলারের মালিক ও চালক এই নিয়ম মানছেন না। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র-বেশিরভাগ গাড়িতে ব্যবহৃত সিলিন্ডারগুলো মূল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং খোলা বাজার থেকে কেনা পুরনো, মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে।

সংগৃহীত বিভিন্ন স্থিরচিত্রে দেখা গেছে, উচ্চচাপের সিলিন্ডারের সংযোগস্থলে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাধারণ টেপ ব্যবহার করে গ্যাস লিক বন্ধের চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক সিলিন্ডার মারাত্মকভাবে মরিচা ধরা ও জীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এমনকি ১০ থেকে ১২ বছরের পুরনো সিলিন্ডারও কোনো ধরনের পুনঃপরীক্ষা ছাড়াই সড়কে চলাচল করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সিলিন্ডার যেকোনো সময় অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। 

এদিকে শেরপুর-নালিতাবাড়ী সড়কে চলাচলকারী একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলায় অনুমোদিত রি-টেস্টিং সেন্টার না থাকায় অনেক চালক বাধ্য হয়েই পরীক্ষা ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছেন। 

শেরপুরের সিএনজি চালক সুলতান মিয়া বলেন, “আইন আছে, কিন্তু পরীক্ষা করানোর সুযোগ নেই। তাই ঝুঁকি নিয়েই গাড়ি চালাতে হয়।”

বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি সিলিন্ডারের গায়ে উৎপাদনকারী দেশ, ওজন ও পরবর্তী পরীক্ষার তারিখ খোদাই করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ‘আফটার মার্কেট’ সিলিন্ডারে এসব তথ্য নেই। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু চক্র ভুয়া স্টিকার ও জাল সনদের মাধ্যমে অবৈধ সিলিন্ডার বৈধ দেখিয়ে ব্যবহার করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত তাপের কারণে সিলিন্ডারের অভ্যন্তরীণ চাপ বেড়ে বিস্ফোরণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। এতে চালক ও যাত্রীদের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে বিআরটিএ’র ফিটনেস পরীক্ষায় অনেক সময় সিলিন্ডারের সূক্ষ্ম কারিগরি ত্রুটি বা অবৈধ সংযোজন যথাযথভাবে যাচাই করা হয় না। 

এ বিষয়ে বিআরটিএ শেরপুর এর সহকারি পরিচালক জিএম নাদির হোসেন বলেন, আমরা সকল সিএনজি লাইসেন্স নবায়নের সময় ফিটনেস সার্টিফিকেট এর সাথে সিলিন্ডারের রিটেস্টিং ছাড়পত্র পেলেই লাইসেন্স নবায়ন করে থাকি। অন্যথায় নবায়ন করিনা। 

তবে শেরপুরে রিটেস্টিং কারখানা নেই। ময়মনসিংহ অফিস থেকে রিটেস্টিং ছাড়পত্র দেওয়া হয়। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ময়মনসিংহ বিভাগেও সিলিন্ডারের কোন রিটেস্টিং কারখানা নেই। একমাত্র ঢাকা রাজধানীতে রিটেস্টিং কারখানা রয়েছে।

এ বিষয়ে বিআরটিএ ময়মনসিংহ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ইফফাত হাশেম বলেন, “সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। যেসব গাড়িতে ত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

এদিকে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের (বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়) আওতাধীন ময়মনসিংহের জন্য কোনো নির্দিষ্ট আঞ্চলিক কার্যালয় বা বিস্ফোরক পরিদর্শক নেই। ময়মনসিংহ অঞ্চলসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শকের কার্যালয়, ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। এতে করে ভোগান্তিতে পড়েছে চালক ও পরিবহন মালিক। 

এ বিষয়ে ঢাকায় দায়িত্বরত সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মোঃ আলিম উদ্দিন এর সাথে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ময়মনসিংহের বিষয়টা আমার দায়িত্বে নেই, আমি এ বিষয়ে কিছু মন্তব্য করতে পারব না। তবে বিস্ফোরক পরিদর্শক মোঃ তোফাজ্জল হোসেন এর সাথে এ বিষয়ে কথা বলুন। পরবর্তী সময় ঢাকায় দায়িত্বরত বিস্ফোরক পরিদর্শক মোঃ তোফাজ্জল হোসেনের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং যাত্রী সাধারণের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনির বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী এডভোকেট আলমগীর কিবরিয়া কামরুল। তিনি বলেন, “গণপরিবহনে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করে লাখো যাত্রীর জীবনকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা স্পষ্টত মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা পাওয়ার মৌলিক অধিকার রয়েছে। আইন ও বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও তদারকি প্রতিষ্ঠানের চরম উদাসীনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষা কেন্দ্র না থাকা কোনো অজুহাত হতে পারে না। এই গাফিলতির কারণে কোনো দুর্ঘটনা বা প্রাণহানি ঘটলে তার দায় বিআরটিএ এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তর এড়াতে পারে না। আমরা অবিলম্বে শেরপুরসহ এই অঞ্চলে একটি অনুমোদিত রি-টেস্টিং সেন্টার স্থাপন এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে 'চলন্ত বোমা' সদৃশ এই অবৈধ সিলিন্ডারগুলো জব্দের দাবি জানাচ্ছি। প্রয়োজনে যাত্রী সাধারণের জীবনের নিরাপত্তায় আমরা আদালতের দ্বারস্থ হতেও বাধ্য হব।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনে ডিজিটাল ডাটাবেজের মাধ্যমে সিলিন্ডারের বৈধতা যাচাই এবং নিয়মিত হাইড্রোস্ট্যাটিক টেস্ট নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, বিআরটিএ ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ সিলিন্ডার অপসারণ করতে হবে।

জনস্বার্থে প্রতিটি গ্যাস ফিলিং স্টেশনে বৈধ পরীক্ষার সনদ ছাড়া গ্যাস সরবরাহ বন্ধ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত