রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম

মাধবপুরে চুরি-ডাকাতির দাপট: নিরাপত্তাহীনতায় নির্ঘুম গ্রামবাসী


  মো: মহিউদ্দিন আহাম্মেদ

প্রকাশ :  ১২ জুলাই ২০২৬, ০১:০৪ দুপুর

এক সময় রাত মানেই ছিল গ্রামের মানুষের নিশ্চিন্ত ঘুম। দিনের পরিশ্রম শেষে কৃষক যখন গোয়ালে গরু বেঁধে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যেতেন, তখন ভোরে উঠে সেই গরুর দুধ দোহন করে শুরু হতো নতুন দিন। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। মাধবপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে রাত নামলেই বাড়ছে উৎকণ্ঠা। কখন কার গোয়াল থেকে গরু উধাও হবে, কোথায় সিঁদ কেটে চুরি হবে কিংবা কোন বাড়িতে ডাকাতের হানা পড়বে—এমন শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটছে অনেক পরিবারের।

গত ৯ জুলাই উপজেলার হইশ্যামা গ্রামে সাবেক ইউপি সদস্য তপন দাদা এর বাড়িতে সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের হাত-পা বেঁধে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ভুক্তভোগী তপন দাদা বলেন, "গভীর রাতে একদল ডাকাত বাড়িতে ঢুকে আমাদের জিম্মি করে ফেলে। পরিবারের সদস্যদের হাত-পা বেঁধে ঘরের আলমারি ও আসবাবপত্র তছনছ করে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান মালামাল নিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই মাধবপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেছি। আমরা চাই পুলিশ দ্রুত ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের গ্রেপ্তার করুক এবং লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার করুক।"

এদিকে গত দুই সপ্তাহে চৌমুহনী, ধর্মঘর, ছাতিয়াইন, নোয়াপাড়া, জগদীশপুর ও বাঘাসুরা ইউনিয়নে অন্তত ১৯টি গরু চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘনশ্যামপুর গ্রামের কৃষক সোহরাব উদ্দিন এক রাতেই চারটি গরু হারিয়েছেন। এছাড়া মঙ্গলপুর, দেবপুর, রসুলপুর, নুরুল্লাপুর, শ্রীমতপুর ও মনিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গরু চুরির ঘটনায় কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।

শুধু গরু চুরি নয়,উপজেলার মনিপুরে দুই শ্রমিকের কাছ থেকে নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। সাকুচাইলে চার কৃষকের সেচ পাম্পের বিদ্যুতের ক্যাবল চুরি হওয়ায় কৃষিকাজ ব্যাহত হয়েছে। রতনপুরে বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার চুরি, দাসপাড়ায় হাঁস-মুরগি চুরি, খরকি গ্রামে সিঁদ কেটে একাধিক বাড়িতে চুরি এবং কালিকাপুরে গ্রামের এক সাংবাদিকের বাড়ি থেকে দুটি মোবাইল ফোন চুরির ঘটনাও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

চৌমুহনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান সোহাগ বলেন, "সাম্প্রতিক কয়েকটি চুরির ঘটনার বিষয়ে আমি অবগত। ক্ষতিগ্রস্তরা বিষয়গুলো আমাকে জানিয়েছেন এবং আমি তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে রাতের টহল আরও বাড়ানো এবং অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছি।"

ছাতিয়াইন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিনহাজ উদ্দিন বলেন, "গ্রামাঞ্চলে ধারাবাহিক চুরির ঘটনায় সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্ন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। জনগণকেও সতর্ক থাকতে হবে এবং সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা ঘটনা দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানাতে হবে।"

মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, "আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। পুলিশকে টহল জোরদার, অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা ও জনগণের সহযোগিতাও অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।"

মাধবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোহেল রানা বলেন, "অনেক ঘটনার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায় না। অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত টহল ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"

স্থানীয়দের দাবি, অপরাধ সংঘটনের পর শুধু তদন্ত নয়, অপরাধ প্রতিরোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নিয়মিত রাতের টহল, গ্রামভিত্তিক নজরদারি, দ্রুত তদন্ত এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পারলেই মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসবে।

মাধবপুরবাসীর প্রত্যাশা—রাতের অন্ধকার যেন আর আতঙ্কের প্রতীক না হয়ে ওঠে; কৃষকের গোয়াল, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি এবং জীবন-জীবিকা যেন নিরাপদ থাকে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত