মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬, ২৫ ফাল্গুন ১৪৩২
শিরোনাম

শেরপুরে অফিসের রেস্ট হাউসকে বাড়ি বানিয়েছেন যুব উন্নয়ন উপ-পরিচালক নুরুজ্জামান 


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ১০ মার্চ ২০২৬, ০৩:৩১ দুপুর

রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়মিত বাড়ি ভাড়া ভাতা বা হাউজ রেন্ট এলাউন্স গ্রহণ করার পরও সরকারি রেস্ট হাউসকে বছরের পর বছর ধরে ব্যক্তিগত আবাসিক ফ্ল্যাট হিসেবে ব্যবহারের এক অভিনব ও ধৃষ্টতাপূর্ণ অনিয়ম উন্মোচিত হয়েছে শেরপুর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। 

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, শেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরী ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি রেস্ট হাউসের কক্ষ অবৈধভাবে দখল করে গত কয়েক বছর ধরে সেখানে বসবাস করছেন। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো ওই কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের ব্যবহারের জন্য পাঁচটি সুসজ্জিত কোয়ার্টার বরাদ্দ থাকলেও উপ-পরিচালক সেখানে অবস্থান না করে কৌশলে কম মূল্যে বা নামমাত্র ভাড়ায় গেস্ট হাউস দখল করে থাকছেন। দাপ্তরিক বিধিমালা অনুযায়ী গেস্ট হাউস বা ডাকবাংলোগুলো মূলত সরকারি ভ্রমণে আসা কর্মকর্তাদের সাময়িক অবস্থানের জন্য তৈরি হলেও নুরুজ্জামান চৌধুরী নির্ধারিত কোয়ার্টার খালি ফেলে রেখে এই সরকারি স্থাপনাটিকে স্থায়ী আবাসনে রূপান্তর করেছেন। 

তিনি প্রতি সপ্তাহের রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নিয়মিতভাবে সেখানে অবস্থান করেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ রেস্ট রুমকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ব্যক্তিগত রান্নাঘরে রূপান্তরিত করেছেন। কক্ষের ভেতরে রান্নাঘর সাজিয়ে তরিতরকারি, ফ্রিজ, মাইক্রোওভেন, সিলিন্ডার বা চুলার ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন সরকারি মূল্যবান আসবাবপত্র ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অন্যদিকে পুরো স্থাপনাটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির মুখে পড়েছে যা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ২০১৮-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং দণ্ডনীয় অসদাচরণ। 

সরকারিবিধিতে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ টাকা, অন্যান্য সরকারি দপ্তরের জন্য ১০০ টাকা এবং বেসরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ২০০ টাকা প্রতিদিন ভাড়ার সাথে সার্ভিস চার্জ ১৫ থেকে ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট রেস্ট হাউসের মুভমেন্ট রেজিস্টার বা লগবুক পর্যালোচনা করতে গিয়ে নজিরবিহীন প্রশাসনিক শিথিলতা লক্ষ্য করা গেছে। প্রত্যেক ব্যবহারকারীর গমনাগমনের সুনির্দিষ্ট তথ্য লিপিদ্ধ থাকার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও নুরুজ্জামান চৌধুরীর দীর্ঘকালীন অবস্থানের কোনো স্বচ্ছ দালিলিক প্রমাণ সেখানে রাখা হয়নি। বিশেষ করে সরকারের অর্থ বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত দৈনিক ভাড়া পরিশোধের কোনো রসিদ বা সরকারি কোষাগারে চালানের মাধ্যমে টাকা জমা দেওয়ার কোনো রেকর্ডও পাওয়া যায়নি। 

চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো তিনি প্রতি মাসে তার মূল বেতনের একটি বড় অংশ বাড়ি ভাড়া ভাতা হিসেবে নিয়মিত উত্তোলন করছেন। সরকারি আবাসন বরাদ্দ নীতিমালা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা যদি সরকারি রেস্ট হাউস বা ডরমিটরিতে অবস্থান করেন তবে তিনি বাড়ি ভাড়া ভাতা পাওয়ার আইনত অধিকারী নন। বাড়ি ভাড়া উত্তোলন করার পরও নির্ধারিত কোয়ার্টার ব্যবহার না করে সরকারি রেস্ট হাউস দখল করে থাকা সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের শামিল যা অডিট আপত্তি ও দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের আওতাভুক্ত একটি গুরুতর অপরাধ। একই সাথে তিনি চাকরির বিধিমালা লংঘন করে শেরপুরে তার কর্মস্থলে অবস্থান না করে ময়মনসিংহে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তবে প্রতি সপ্তাহে রবিবার শেরপুর আসেন এবং বৃহস্পতিবার চলে যান। এই ৫দিন তিনি শেরপুরে বাড়ি ভাড়া না করে অবৈধভাবে অফিসের ওই রেস্ট হাউস ব্যবহার করছেন।

এসব অনিয়মের বিষয়ে অভিযুক্ত উপ-পরিচালক নুরুজ্জামান চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন সন্তোষজনক বা দাপ্তরিক ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারেননি। বরং তিনি পুরো বিষয়টিকে ব্যক্তিগত সুবিধা হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে প্রকৃত প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, আমি এখানে অতিথি হিসেবে থাকি এবং বিল পে করি। এছাড়া তিনি তার রেস্ট হাউসকে বাড়ি বানানোর দৃশ্য ভিডিও করে অনুসন্ধান করার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, আমার অনুমতি ছাড়া কেন আপনি এখানে আসলেন। 

জেলা পর্যায়ের একজন নীতিনির্ধারক কর্মকর্তার এমন অরাজক কর্মকাণ্ডের ফলে একদিকে যেমন সরকার বিশাল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে অন্যদিকে সরকারি সফরে আসা অন্যান্য কর্মকর্তাদের আবাসন সংকটে পড়ে দাপ্তরিক কাজে চরম বিঘ্ন ঘটছে। প্রশাসনের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের এমন অবাধ লুণ্ঠন রোধে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও দুর্নীতি দমন সংস্থার আশু হস্তক্ষেপ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভোগ করা সুযোগ-সুবিধা ও উত্তোলিত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত প্রদানসহ তাকে দ্রুত বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনাই এখন জনদাবিতে পরিণত হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত