রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম
চাকরি হারানোর ভয় নয়, নতুন দক্ষতা শেখার সময়

এআই নয়, এআই-জানা মানুষই হয়তো আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী


  সুহাদা মেহজাবিন

প্রকাশ :  ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪০ দুপুর

ঢাকার ধানমন্ডির একটি ছোট ফ্ল্যাটে রাত জেগে অনলাইন ব্যবসার হিসাব করছেন অলকানন্দা। ফেসবুকে তাঁর পোশাকের পেজ আছে। আগে প্রতিটি পণ্যের বর্ণনা, পোস্টের ক্যাপশন, বিজ্ঞাপনের লেখা—সবকিছু নিজেকেই করতে হতো। এখন এআই দিয়ে কয়েক মিনিটে তিন-চার ধরনের ক্যাপশন বানিয়ে নিচ্ছেন।

কিন্তু কাজটা পুরোপুরি এআইয়ের হাতে ছেড়ে দেননি। কোন ভাষাটা বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে স্বাভাবিক শোনাবে, কোন অফারটা ঈদ বা পূজোর আগে বেশি কার্যকর হবে—সিদ্ধান্তটা তিনিই নিচ্ছেন।

এটাই হয়তো এআই-যুগের নতুন বাস্তবতা।

এআই আপনার কাজ কেড়ে নেবে কি না—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আপনি এআইকে কাজে লাগাতে পারছেন কি না।

চাকরির বাজারে কী বদলাচ্ছে?

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের Future of Jobs Report 2025 অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ১৭ কোটি নতুন কাজ তৈরি হতে পারে, পাশাপাশি ৯ কোটি ২০ লাখ কাজ স্থানচ্যুত হতে পারে। একই সময়ে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রায় ৩৯ শতাংশ দক্ষতার পরিবর্তন হতে পারে।

অর্থাৎ সব চাকরি হারিয়ে যাবে—এমন নয়। বরং অনেক চাকরির ভেতরের কাজের ধরন বদলে যাবে।

ঢাকার একটি অফিসে আগে যে কর্মী সারাদিন Excel-এ তথ্য সাজাতেন, এখন তিনি এআই দিয়ে ডেটার সারসংক্ষেপ তৈরি করতে পারেন। একজন ব্যাংক কর্মকর্তা গ্রাহকের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর তৈরিতে এআই ব্যবহার করতে পারেন। একজন সাংবাদিক তথ্য সাজানোর কাজে এটি ব্যবহার করতে পারেন।

কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত, যাচাই এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের জায়গায় প্রয়োজন থাকবে মানুষেরই।

ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও বদল আসছে

বাংলাদেশের অনেক তরুণ Fiverr, Upwork বা দেশীয় ক্লায়েন্টের জন্য গ্রাফিক ডিজাইন, কনটেন্ট, ভিডিও এডিটিং কিংবা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের কাজ করেন।

ধরা যাক, একজন গ্রাফিক ডিজাইনার আগে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট তৈরি করতে দুই ঘণ্টা সময় নিতেন। এখন এআই দিয়ে কয়েকটি ধারণা, রঙের কম্বিনেশন বা প্রাথমিক ডিজাইন তৈরি করে তিনি দ্রুত কাজ শুরু করতে পারেন।

তবে ক্লায়েন্টের ব্র্যান্ড বোঝা, স্থানীয় সংস্কৃতি বোঝা এবং শেষ ডিজাইনটি ঠিকঠাক করা—এসব দক্ষতা তাঁর নিজেরই থাকতে হবে।

অর্থাৎ এআই হয়তো কাজের গতি বাড়াবে, কিন্তু দক্ষতার প্রয়োজন কমাবে না।

এআইয়ের যুগে শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি

ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়তো অ্যাসাইনমেন্টের জন্য এআই ব্যবহার করছে। ময়মনসিংহের আরেক শিক্ষার্থী চাকরির CV বানাচ্ছে। নেত্রকোণার কেউ ইংরেজিতে ই-মেইল লেখার অনুশীলন করছে।

এগুলোতে এআই সহায়ক হতে পারে।

কিন্তু শুধু “লিখে দাও” বললে হবে না। শিক্ষার্থীকে জানতে হবে—তথ্যটি ঠিক কি না, যুক্তিটি গ্রহণযোগ্য কি না এবং নিজের ভাষায় বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে পারছে কি না।

একসময় ভালো ফলাফল, একটি ডিগ্রি আর একটি চাকরি—এই তিনটাকে বেশ সুন্দর একটি প্যাকেজ মনে করা হতো।

এখন প্যাকেটটা একটু বড় হয়েছে।

ডিগ্রির সঙ্গে দরকার দক্ষতা। আর দক্ষতার সঙ্গে দরকার নতুন কিছু শেখার অভ্যাস।

আজ যে সফটওয়্যার শিখছেন, কাল সেটার নতুন সংস্করণ আসবে। আজ যে এআই টুল জনপ্রিয়, দুই বছর পর হয়তো তার জায়গায় অন্য কোনো টুল আসবে।

তাই শিক্ষার্থীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হতে পারে—নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা।

প্রশ্ন করতে জানা, তথ্য যাচাই করতে জানা, সমস্যা বিশ্লেষণ করা, নিজের বক্তব্য পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা এবং প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো—এসব দক্ষতার গুরুত্ব বাড়ছে। WEF-এর হিসাবেও analytical thinking সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ core skills-এর একটি, আর AI ও big data দ্রুত বাড়তে থাকা দক্ষতার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে।

তাই পরীক্ষায় ১০০ নম্বর পাওয়া ভালো। কিন্তু বাস্তব জীবনে একটা সমস্যার সমাধান করতে পারা—সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বাংলাদেশের নারীদের জন্যও সুযোগ

ধরা যাক, নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলার একজন নারী ঘরে বসে পোশাক তৈরি করেন। তিনি ফেসবুকে পণ্য বিক্রি করতে চান। এআই দিয়ে পণ্যের ক্যাপশন, পোস্টের আইডিয়া, অফারের ভাষা কিংবা গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর তৈরিতে সহায়তা নিতে পারেন।

আবার একজন গৃহিণী অনলাইন খাবারের ব্যবসা শুরু করে মেনু লেখা, প্রচারণার আইডিয়া বা কাস্টমার মেসেজ তৈরিতে এআই ব্যবহার করতে পারেন।

তবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হলে ডিজিটাল দক্ষতা, ইন্টারনেট সুবিধা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগও দরকার।

গ্রামের তরুণের জন্যও এআই

এআইয়ের সুযোগ শুধু ঢাকার অফিসে সীমাবদ্ধ নয়।

রাঙামাটির একজন তরুণ স্থানীয় ব্যবসার জন্য পোস্ট তৈরি করতে পারেন। ময়মনসিংহের একজন শিক্ষার্থী ইংরেজি শেখার অনুশীলন করতে পারেন। খুলনার একজন উদ্যোক্তা পণ্যের বাজারজাতকরণের ধারণা নিতে পারেন।

অর্থাৎ স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে এআই এখন শহর-গ্রামের ব্যবধান কিছুটা কমানোর সুযোগও তৈরি করছে। তবে এই সুযোগ বাস্তবে কাজে লাগাতে ডিজিটাল শিক্ষা ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেটের প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশও প্রস্তুতির প্রশ্নের সামনে

বাংলাদেশেও এআই নিয়ে প্রস্তুতির কাজ এগোচ্ছে। UNESCO ও UNDP-এর সহযোগিতায় বাংলাদেশের AI Readiness Assessment করা হয়েছে, যেখানে AI গ্রহণের পাশাপাশি নৈতিকতা, অন্তর্ভুক্তি, মানবাধিকার, নীতিমালা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়।

এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, সরকারি সেবা—সব জায়গার আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।

শুধু এআই জানলেই হবে না

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

একজন ব্যাংক কর্মকর্তা এআই ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু গ্রাহকের সমস্যাটা বুঝতে হবে তাঁকেই।

একজন শিক্ষক এআই দিয়ে পাঠ পরিকল্পনা বানাতে পারেন, কিন্তু শিক্ষার্থীর দুর্বলতা বুঝতে হবে তাঁকেই।

একজন উদ্যোক্তা এআই দিয়ে বিজ্ঞাপনের ১০টি কপি বানাতে পারেন, কিন্তু কোনটি বাংলাদেশের ক্রেতার কাছে কাজ করবে—সেটা তাঁকেই বুঝতে হবে।

তাই ভবিষ্যতের দক্ষতা শুধু প্রযুক্তি নয়। প্রযুক্তি, বিচারবুদ্ধি , যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার সমন্বয়ে নতুন কর্মদক্ষতা বাড়াতে হবে।

আজ থেকেই কী করবেন?

১. নিজের কাজের একটি ছোট অংশ এআই দিয়ে করিয়ে দেখুন।

২. এআইয়ের তথ্য যাচাই করার অভ্যাস করুন।

৩. Excel, English, Communication, Data Analysis-এর মতো ব্যবহারিক দক্ষতা বাড়ান।

৪. নিজের পেশায় এআই কোথায় সময় বাঁচাতে পারে, সেটি খুঁজে বের করুন।

৫. একটি টুল নয়, শেখার অভ্যাস তৈরি করুন।

শেষ কথা

এআই হয়তো আপনার চাকরি সরাসরি নিয়ে নেবে না।

কিন্তু একই অফিসে আপনার পাশে বসা একজন কর্মী যদি এআই ব্যবহার করে আপনার চেয়ে দ্রুত রিপোর্ট তৈরি করেন, ভালো আইডিয়া দেন এবং বেশি কাজ সামলাতে পারেন—তাহলে প্রতিযোগিতাটা সেখানেই।

তাই ভবিষ্যতের প্রশ্ন সম্ভবত—“এআই কি আমার চাকরি নেবে?” এটা না হয়ে “এআই দিয়ে আমি আমার কাজটাকে কতটা ভালো করতে পারি?” এটা হওয়া উচিত।

কারণ আপনার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী এআই নয়। হয়তো সেই মানুষটি, যে এআইকে নিজের কাজের সঙ্গী বানিয়ে ফেলেছে।

 

সুহাদা মেহজাবিন
ডিরেক্টর
এডুকেশন এন্ড স্কিলস ডেভেলপমেন্ট
আরবান।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত