চায়ের পাতায় নতুন গল্প এনটিসির নিলামে কেজিপ্রতি রেকর্ড ২৮০ টাকা
মো: মহিউদ্দিন আহাম্মেদ
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৯ দুপুর

চায়ের মান ভালো হলে নিলামের বাজারেও তার প্রতিফলন ঘটে,এবার তারই প্রমাণ দিল রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানি লিমিটেড (এনটিসি)। চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক চা-নিলামে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত চা বিক্রি হয়েছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গড় দামে। একই সঙ্গে চলতি মৌসুমে উৎপাদনও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে উৎপাদন ও আয়ে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই চা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
গত ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক চা-নিলামে এনটিসির অধীন ১২টি চা-বাগানের মোট ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৬০ কেজি চা বিক্রি হয়। প্রতি কেজি চায়ের গড় বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ২৮০ টাকা ৫৯ পয়সা। এনটিসির ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ গড় বিক্রয়মূল্য বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সরকার নির্ধারিত ২৪৫ টাকা ভিত্তিমূল্যের তুলনায় প্রতি কেজিতে উল্লেখযোগ্য বেশি দামে চা বিক্রি হওয়ায় ওই নিলাম থেকে এনটিসির মোট আয় হয়েছে ৪ কোটি ৪৭ লাখ ৭৩ হাজার ৭২২ টাকা।
নিলামে অংশ নেওয়া ১২টি বাগানের মধ্যে রয়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর ও তেলিয়াপাড়া, চুনারুঘাটের চণ্ডীছড়া ও পারকুল, মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার পাত্রখোলা, কুর্মা, চম্পারাই, মদনমোহনপুর, লাক্কাতুরা, মাধবপুর প্রেমনগর ও বিজয়া চা-বাগান। এসব বাগানে উৎপাদিত উন্নতমানের অর্থোডক্স ও সিটিসি চায়ের বেশ কয়েকটি লট প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।
তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক দেওয়ান বাহাউদ্দিন লিটনের মতে, চায়ের এই ভালো দাম পাওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত উদ্যোগ। চায়ের গুণগত মান বাড়াতে শ্রমিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বাগান পর্যায়ে নিবিড় তদারকি এবং ‘দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি’ চয়ন নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এসব উদ্যোগের ফলে কাঁচা পাতার গুণগত মান বেড়েছে। পাশাপাশি উৎপাদিত চায়ের রং, ঘ্রাণ ও স্বাদেও এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। আর এর প্রভাব পড়েছে নিলামের বাজারদরেও।
শুধু দাম নয়, উৎপাদনেও এগিয়ে যাচ্ছে এনটিসি।
প্রতিষ্ঠানটির উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত এনটিসির চা-উৎপাদন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে।
তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও আমরা সার্বিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখেছি। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কারখানায় মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলেই উৎপাদন ও বিক্রয় উভয় ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক সাফল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
চা শিল্প যখন প্রতিকূল আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, শ্রম ব্যয় বৃদ্ধি ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন এনটিসির উৎপাদন বৃদ্ধি ও রেকর্ড দামে চা বিক্রির এই খবরকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মানসম্মত চা উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দেশের চা শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এনটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিয়াউল হাসান বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বাগান শ্রমিকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ আমাদের বাগানগুলো ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধি ও মান উন্নয়নের যে বিশেষ কর্মসূচি আমরা হাতে নিয়েছি, তার সুফল এখন দৃশ্যমান।
তিনি জানান, চলতি আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মৌসুমের বাকি সময়েও আরও ভালো উৎপাদন ও ভালো বিক্রয়ের প্রত্যাশা করছে এনটিসি।
এনটিসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের চারা রোপণ, কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েও কাজ করছে এনটিসি।
ফলে চট্টগ্রামের নিলামে রেকর্ড দামে চা বিক্রির এই সাফল্য শুধু একটি নিলামের হিসাব নয় এটি উৎপাদন বাড়ানো, চায়ের মান উন্নয়ন এবং ঘুরে দাঁড়ানোর পথে এনটিসির নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিতও দিচ্ছে।




_medium_1782217632.jpg)
_medium_1781507171.jpg)

