বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম

জুলাই আন্দোলন শেরপুরে ৩ শিক্ষার্থী হত্যা: দুই বছরেও থামেনি স্বজনদের আহাজারি


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০২ বিকাল

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ৪ আগস্ট উত্তপ্ত শেরপুর জেলা শহরে প্রাণ হারান তিন কলেজ শিক্ষার্থী। আহত হন আরও অনেকে। এসব পরিবারের সদস্যদের আহাজারি আর বিচার প্রত্যাশা নিয়ে দুই বছর অতিবাহিত হলেও কোন মামলারই বিচার সম্পন্ন হয়নি। চার্জশিট দাখিল আর তদন্তেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে এসব মামলা।

নিহত ৩ জনের একজন সবুজ মিয়া (১৮) আওয়ামী লীগের মিটিং থেকে ছোড়া গুলিতে নিহত হয়। শ্রীবরদী উপজেলার রূপাপাড়া গ্রামের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সবুজ মিয়া (১৮) বাবার অসুস্থতার কারণে লেখাপড়ার পাশাপাশি ওষুধের দোকানে কাজ করে সংসার চালাতেন। 

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে শেরপুর শহরের কয়েক জায়গায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা জড়ো হোন। সবুজও সেদিন বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিতে শহরে গিয়েছিল। খরমপুর-কলেজমোড় সড়কে বিপরীত দিক থেকে আসা আওয়ামী লীগের একাংশের মিছিল থেকে ছোড়া গুলি সবুজের মাথার ডান পাশে লাগলে মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। দ্রুত তাকে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

সবুজের মা সমেজা বেগম বলেন, দুই বছর ধইরা পোলা হারাইছি। কত জায়গায় গেলাম বিচার পাইলাম না। আমার স্বামীও অনেকদিন ধরে অসুস্থ, ছেলের মৃত্যুর পর থেকে অবস্থা আরও খারাপ। বর্তমানে অনেক মানসিক চাপে আছি।;এ সময় ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন তিনি।

নিহত অপর দুইজন মাহবুব এবং সৌরভ আন্দোলন দমনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে থাকা ম্যজিস্ট্রেটের গাড়ি চাপায় মৃত্যু হয়।

৪ আগস্টই সবুজের মৃত্যুর আধা ঘণ্টা পর বিকেল সোয়া ৫টার দিকে খরমপুর সড়কে আবার মিছিল বের করেন ছাত্র-জনতা। মিছিলের পেছন দিক থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর যৌথ টহলের মধ্যে থাকা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে বহনকারী একটি গাড়ি চাপা দেয় বেশ  কয়েকজন আন্দোলনকারীকে।

শেরপুর জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তরিকুল ইসলাম শাকিলের নির্দেশে চালক হারুনুর রশীদ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে দেন। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান সদর উপজেলার চৈতনখিলা এলাকার বাসিন্দা ও শেরপুর সরকারি কলেজের সম্মান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মাহবুব আলম (২১) এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার পাইকুড়া-জড়াকুড়া এলাকার বাসিন্দা ও সেকান্দর আলী ডিগ্রি কলেজের সম্মান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শারদুল আশীষ সৌরভ (২১)। আহত হন আরও কয়েকজন। এই গাড়ি চাপার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক ভাইরাল হয়ে যায়। একই সাথে ভিডিওটি দেখে পুরো জেলায় আরো উত্তাল হয়ে ওঠে।

একই সময়ে গাড়ি চাপায় নিহত অপরজন মাহবুব আলম। অসুস্থ বাবার পাশে দাঁড়াতে ফ্রিল্যান্সিং করে সংসারের হাল ধরেছিলেন মাহবুব। একই কাজ করতেন সৌরভও।

মাহবুবের মা মাফুজা খানম বলেন, দুই বছর হইয়া গেলো আমার পুলার হত্যার বিচার পাইলাম না। যে ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি চাপা দিল আমার পুলারে সেই ম্যাজিস্ট্রেটের বিচার আজও পাইলাম না। মাহবুব কইতো আমি বড় আইটি উদ্যোক্তা হমু এবং তোমার জন্য বাড়ি-গাড়ি কইরা দিমু। এ কথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মাহবুব আলমের মা।

মাহবুব এর বড় ভাই মাজহারুল ইসলাম বলেন, ভাইয়ের কথা মনে হলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। আমার ভাই হত্যার প্রকৃত আসামিদের দ্রুত বিচার চাই আমরা‌।

সৌরভের বাবা ছোরহাব আলী বলেন, ‘ছেলের কথা মনে হইলে ঠিক থাকবার পারি না। মামলা করছিলাম বিচারের আশায়, কোন অগ্রগতি দেহি না। পোলা হত্যার বিচার দেখতে দেখতে হয়তো আমিই কবরে চলে যামু।’

শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনীষা আহমেদ বলেন, আমরা নিহত সবুজ মিয়ার মা এবং তার পরিবারের নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছি। সবুজ ছাড়াও অন্যান্য আহত-নিহত সকল পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ও অনুদান দেওয়া হচ্ছে। জুলাই সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচি আমরা তাদেরকে সাথে নিয়ে পালন করে থাকি।

শেরপুর জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, নিহত মাহবুবের পরিবারসহ জুলাই আন্দোলনে আহত-নিহত পরিবারকে আমাদের পক্ষ থেকে সবসময় বিভিন্ন অনুদান ও সরকারি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। তারা কোন সমস্যার কথা জানালে সাথে সাথে আমরা সমাধান করে দেওয়ার চেষ্টা করি। এছাড়া জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মাহবুব হত্যার বিচারের বিষয়টা আদালতে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা শেরপুর সদর থানায় পৃথক ৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। গত বছরের ৩০ জুন পুলিশ ৫০৫ জনকে আসামি করে ৩ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়। এসব মামলার মধ্যে মাহবুব আলম হত্যা মামলার চার্জশিটে উল্লেখযোগ্য বেশ কয়েকজন আসামির নাম বাদ পড়ায় পুনরায় সম্পূরক চার্জের জন্য আবেদন করা হলে গত মাসে তা পুনরায় সম্পূরক চার্জ গঠন করে আদালতে দেয়া হয়েছে বলে এই মামলায় তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই এর পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে অন্য দুটি মামলার চার্জ গঠন করে ইতিমধ্যে আদালতে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ভুঁঞা।

চার্জশিটে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, সাবেক হুইপসহ ৪ এমপি, ৬ উপজেলা চেয়ারম্যান, চার মেয়র, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর জিপচালকসহ অনেকের নাম রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত