বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ২৪ চৈত্র ১৪৩২
শিরোনাম

শেরপুরে আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবির মা-কন্যা নানা ঘাত-প্রতিঘাতে আজও বেঁচে আছেন


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০১:০৯ রাত

শেরপুরের বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক নীতিশ রায়ের তোলা “তৃষ্ণা” শিরোনামের ছবির সেই মা কুমুদিনী কোচ ও কন্যা রিতা কোচ নানা আঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে আজও বেঁচে আছেন।

৪৩ বছর আগে তোলা 'তৃষ্ণা' শিরোনামের ছবি মা‌য়ের কোলে থাকা শিশু রিতা এখন তার একমাত্র সন্তান নিয়েও মা কুমুদিনী কোচ এর দুর্গম পাহাড়ি বাড়িতেই থাকেন।

আশির দশকের কোন এক সময় শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকার শাল-গজারি বাগানের ফাঁকে পাহাড়ি ছড়ার পাশে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছিলেন শেরপুরে বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক নীতিশ রায়। ঠিক এমন সময় কোচ সম্প্রদায়ের আদিবাসী নারী তার পিঠে শিশু কন্যা কে নিয়ে পিপাসা মিটাতে দুই হাত দিয়ে ওই ছড়ার পানি তুলে পান করছিলেন। এ সময় পিপাসাক্লান্ত তার শিশু কন্যাটিও মায়ের বুকের দুধ পান করছিলেন। দৃশ্যটি দেখে আলোকচিত্রী নীতিশ রায় ক্যামেরার শাটার টিপলেন। কিন্তু ওই কোচ নারী কিছুই টের পায়নি। ওই কোচ নারীর নাম কুমুদিনী কোচ। বাড়ি পার্শ্ববর্তী উত্তর গান্ধীগাও গ্রামের কোচ পাড়ায়। আলোকচিত্রী নীতিশ রায় বেশ কয়েকটি ছবি তুলে বাড়িতে এসে ভাবছিলেন ছবির নাম কী দেয়া যায়। এক পর্যায়ে যেহেতু মা মেয়ে দুজনই তৃষ্ণার্ত ছিল তাই ছবির নাম দিলেন “তৃষ্ণা”। 

এর কিছুদিন পর ইউনেসকোর এশিয়ান কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে ১৯৮২ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত সপ্তম এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ছবিটা পাঠালে আন্তর্জাতিক ‘ইয়াকুল্ট’ পুরস্কার পায় ছবিটি। এ নিয়ে ওই বছরের ৬ আগস্ট নীতিশ রায়ের ছবিসহ আলোকচিত্রটি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

নীতিশ রায় ছিলেন একাধারে একজন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক ছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার ফটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর দৈনিক সংবাদ, ভোরের কাগজ, ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। নিঃসন্তান নীতিশ রায় স্ত্রী লেখক ও কবি সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে শেরপুর শহরের নায়ানি বাজার মহল্লায় বসবাস করতেন তিনি। নীতিশ রায় ১৯১৭ সালে এবং এর কিছুদিন পর তার স্ত্রী সন্ধ্যা রায় পরলোকগমন করেন।

‘তৃষ্ণা’ শুধু একটি আলোকচিত্র নয়, শেরপুরের অবহেলিত ও দুর্গম গারো পাহাড়ের মানুষের জীবনছবি। ৪৩ বছর পর সেই ছবির মানুষদের খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে আসে আরেক বাস্তবতা—ছবির বাইরের কঠিন জীবন। 

‘তৃষ্ণা’ ছবির সেই নারী কুমুদিনী কোচের বর্তমান বয়স প্রায় ৬৬ বছর। আর কন্যা রিতা কোচের বয়স ৪৫ বছর। বাড়ি ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী উত্তর গান্ধিগাঁও কোচপাড়া গ্রামে। পাহাড়ি টিলায় ১৭ শতক ভিটায় তাঁর বসবাস।

স্মৃতির ঝাঁপি খুলে কুমুদিনী কোচ বলেন, ‘বাপের অসুস্থতার খবর পাইয়া তিন মাসের রিতাকে পিঠে নিয়া নওকুচি বাপের বাড়ি যাইতেছিলাম। বাড়ির কিছুদূর দূরে পাহাড়ি ছড়ার পানিতে পিপাসা মিটাতে জল খাই। কিন্তু ওই সময়ে কে ছবি তুলেছে তা জানিনা। কিছুদিন পর আমাদের নকশী ক্যাম্পের (বর্তমান বিজিবি ক্যাম্প) সাথে আমার এক আত্মীয় ছবিটি আমাকে দেখায়। ছবিটি দেখে তখন লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিই।

ছবিটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার পর লোকমুখে শুনেছেন কুমুদিনী কোচ। নীতীশ রায় একসময় বাড়িতে গিয়ে একটি সাদা-কালো ছবি দিয়ে গিয়েছিলেন। সময়ের স্রোতে সেটি হারিয়ে যায়। বয়সের ভারে এখন চোখে ঠিকমতো দেখেন না তিনি। সামান্য জমিতে চাষাবাদ আর সন্তানদের সহায়তায় নাতিদের নিয়ে সময় কাটে তাঁর। ছবির যে শিশুটি কুমুদীনির বুক পান করছিলো তার নাম রিতা কোচ। সেদিন কুমুদীনিকন্যার বয়স ছিলো মাত্র দেড় মাস। এখনও মা মেয়ে দুজনই পাশাপাশি প্রায় সমসুখী হয়ে বেচে আছেন ছবির স্বাক্ষী হয়ে। 

কুমুদীনি কোচের সংসারটা একদিন যেন চাঁদের হাট ছিলো। স্বামী ছিলেন পাথরশ্রমিক। বৈদনাথ কোচ। ২০০৩ সালের একদিন পাথর উত্তোলনের কাজে পাহাড়ে যান কুমুদীনির স্বামী বৈদনাথ কোচ। বাড়িতে খবর আসে মাটি আর পাথর চাপায় কয়েকজন শ্রমিক মারা গেছেন। সেই লাশগুলোর মধ্যে বৈদনাথ কোচকেও পাওয়া যায়। সাথে সাথে পাচ কন্যা আর তিন পুত্র সন্তানকে নিয়ে কুমুদীনি যেন অথই সাগরে পড়ে গেলেন। এখন ছেলে পেলেরা বড় হয়েছে যার যার মতো সংসারী হয়েছে কুমুদীনির বাড়ি ভরা নাতি পুতি।  তার সরল ভাষ্য, "বুড়া হইছি, এহন খাই আর কুহাই, কুহাই আর ঘুমাই।"

কুমুদিনই কোচের কয়েকটি গরু রয়েছে এই গরুগুলো পাহাড়ের সমতল ভূমিতে ছেড়ে দিয়ে আসেন সকালে এবং সন্ধ্যার আগে সেগুলোকে বাড়ির নিয়ে আসেন। কোনদিনই কোচের নয় ছেলে মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছেলে স্বপন কোচ অনেক আগেই ভারতে চলে গেছে। দ্বিতীয় কন্যা রিতা কোচ এর স্বামী ভজন কোচ ২০১৬ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে মায়ের সাথেই থাকেন রিতা কোচ। কুমুদিনী কোচের পঞ্চম সন্তান রুপন কোচ অনেক আগেই মারা গেছে। এরপর জীবিত সন্তানদের মধ্যে বেঁচে আছে লিবিতা কোচ, তাপস কোচ, মল্লিকা কোচ, দুর্জয় কোচ রাধা কোচ ও সুস্মিতা কোচ। এই ছেলে-মেয়ে এবং জামাইদের নিয়েই তার এখন সংসার।

নীতীশ রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী কবি সন্ধ্যা রায়ও অসুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি সমাজসেবী ও শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি রাজিয়া সামাদ ডালিয়ার কাছে ‘তৃষ্ণা’ ছবির মূল কপি, ক্যামেরাসহ বিভিন্ন সনদ সংরক্ষণের জন্য হস্তান্তর করেন। পরে রাজিয়া সামাদ ক্যামেরাসহ কিছু ছবি ও সনদ জামালপুরে গান্ধী আশ্রমের মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘরে প্রদান করেন। তবে ‘তৃষ্ণা’ ছবিটি  শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতিতে সংরক্ষিত আছে।

এ বিষয়ে রাজিয়া সামাদ বলেন, ‘নীতীশ রায় ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। অসুস্থ অবস্থায় তৃষ্ণা ছবির মূল কপি, সনদ ও ক‌্যা‌মেরা আমার কাছে রেখে যান। পরে আমরা ছবি ও ক্যামেরা জাদুঘরে দিয়েছি। তবে তৃষ্ণা ছবিটি এখনো আমাদের কাছেই সংরক্ষিত আছে।’

সম্প্রতি নীতীশ রায়ের ‘তৃষ্ণা’ ছবিটি নিজের বলে দাবি করেছেন সাখাওয়াত তমাল নামের এক ব্যক্তি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে। শেরপুর জন–উদ্যোগের আহ্বায়ক ও শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে অনলাইনে একটি নিবন্ধও লিখেছেন।

এ বিষয়ে আবুল কালাম আজাদ বলেন, ছবিটি শেরপুরকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করেছে। নীতীশ রায়ের মতো আলোকচিত্রী না থাকলে হয়তো দৃশ্যটি তাঁরা দেখতে পেতেন না। তাঁর তোলা সংরক্ষিত ছবি নিয়ে জনউদ্যোগের আয়োজনে ১৯ এপ্রিল শহরের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রদর্শনী হবে। এতে নীতীশ রায়ের মতো আলোকচিত্রীকে স্মরণ করা হবে। পাশাপাশি প্রদর্শনীতে ‘তৃষ্ণা’ ছবির মা-মেয়ে উপস্থিত থাকবেন।

খ্যাতিমান আলোকচিত্রী নীতিশ রায় ২০১৭ ইহকালের মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন পরপারে। রেখে গেলেন জীবন্ত করে অনেক ইতিহাস, অনেক ঐতিহ্য। তার হাতে তোলা মহান মুক্তিযুদ্ধ এক অনন্য দলিল। তার ছবিগুলো শুধু কেবলি ছবি নয়। তার স্মৃতি, তার সৃষ্টিকর্মের সংরক্ষণ দরকার বলে মনে করছেন শেরপুরের সচেতন মহল।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত