শেরপুর-৩ উপনির্বাচন: মাঠে বিএনপি, প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি জামায়াত
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:০২ বিকাল

আগামী ৯ এপ্রিল স্থগিতকৃত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে নির্বাচনি উত্তাপ এখন তুঙ্গে। এক সময়ের অপরাজেয় বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনটিতে হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে এবার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে প্রখ্যাত 'হক পরিবার'। তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল এবার শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ভরসা না করে সপরিবারে নির্বাচনী ময়দানে নেমেছেন।
দীর্ঘ দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকার পর আসনটি পুনরুদ্ধারে পারিবারিক কৌশলী প্রচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে দুই উপজেলার জনপদ। তবে এই চড়াই-উতরাইয়ের পথে তাদের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থানের প্রার্থী মৃত নূরুজ্জামান বাদলের ছোট ভাই মাসুদুর রহমান মাসুদ। এখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি বনাম জামায়াতের সঙ্গে।
শেরপুর-৩ আসনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭৯ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এখানে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল বিএনপির প্রবীণ কান্ডারী মরহুম ডা. সেরাজুল হকের। তাঁর মৃত্যুর পর ১৯৯৪ সালে রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে তার ছেলে মাহমুদুল হক রুবেলের। বাবার জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে ১৯৯৪, ৯৫ ও ৯৬ সালে টানা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে চমক দেখিয়েছিলেন তিনি।
তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পারিবারিক কোন্দলের কারণে আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। দীর্ঘদিনের সেই রাজনৈতিক ক্ষত মুছে ফেলে এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন সাবেক এমপি রুবেল।
এবারের নির্বাচনে জয়ের লক্ষ্য অর্জনে ভোটারদের বিশাল এক অংশকে টার্গেট করেছে হক পরিবার। আসনের ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন ভোটারের মধ্যে অর্ধেকই নারী ভোটার। এই বিশাল নারী ভোটব্যাংক দখলে নিতে বিএনপির প্রার্থীর স্ত্রী ফরিদা হক দিপা এবং মেয়ে আইন বিষয়ের শিক্ষার্থী রুবাইদা হক রিমঝিম দিনরাত প্রত্যন্ত অঞ্চলের পাড়ায় পাড়ায় উঠান বৈঠক করছেন। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া পড়ুয়া ছেলে তরুণ রাফিদুল হক শিক্ষিত ও তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। পারিবারিক এই বিশেষ প্রচারণা সাধারণ ভোটার এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আমিনুল ইসলাম বাদশার মতো প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থী রুবেলের সমর্থনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় বিএনপি এখন অনেকটাই সুসংহত।
তবে নির্বাচনী এলাকার সুস্থ বিবেক সম্পন্ন চিন্তাশীল মহল মনে করছেন জয়ের পথ মোটেও মসৃণ নয়। ২০ দলীয় জোটের সমীকরণ পাল্টে যাওয়ায় এবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। জামায়াতের সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী এবং নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক রুবেলের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। জামায়াত প্রার্থীও জয়ের বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প নিয়েই প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, মাহমুদুল হক রুবেল জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। তিনি বলেন, 'স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বন্যা ও করোনার দুর্যোগে আমি সবসময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিলাম। শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতীর মানুষ বরাবরের মতোই হক পরিবারের পাশে থাকবে এবং ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করবে।' শেষ পর্যন্ত এই মর্যাদাপূর্ণ আসনে হক পরিবো দুর্গ পুনরুদ্ধার হবে না কি জামায়াত নতুন ইতিহাস গড়বে, তা নিয়ে এখন সর্বত্রই চলছে জল্পনা-কল্পনা।
এদিকে সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি এখন (শ্রীবরদী- ঝিনাইগাতী) শেরপুর-৩ আসনের দিকে। তবে জামায়াতের প্রার্থীর একটি বক্তব্য ভাইরাল হয়ে গেছে। ভিডিওতে দেখা ও শুনা যায়, তিনি বলেন প্রয়োজনে এক হাজার নেতাকর্মী শহীদ হবেন। আমার ভাইয়ের রক্তের বদলা নেয়া হবে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে। এ আসনের মাটিতে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের আমির এবং এ আসনের পূর্বের প্রার্থী মরহুম নুরুজ্জামান বাদল এবং শহীদ রেজাউল করিমের এর রক্তের দাগ লেগে আছে।
নুরুজ্জামান বাদল ১২ ফেব্রুয়ারির আগে ৪ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন। তারই ভাই মাসুদুর রহমান দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এ আসনের শ্রীবরদী উপজেলার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল রেজাউল করিম গত ২৮ জানুয়ারি এই আসনের ঝিনাইগাতী উপজেলায় বিএনপির-জামায়াতের এক সংঘর্ষে নিহত হন। এরপর নির্বাচন ছবির ঘোষণা করার পর পরবর্তীতে আগামী ৯ এপ্রিল নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশন।


_medium_1775040867.jpg)




