শেরপুরে আধুনিক রেসিপির ভিড়েও আজও টিকে আছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী খাবার “পিঠালি”
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:১৮ দুপুর

দেশের প্রতিটি অঞ্চল কোন না কোন খাবারের জন্য বিখ্যাত। অনেক অঞ্চল শুধুমাত্র খাবারেই জন্যই বিখ্যাত হয়েছে। সেসব অঞ্চলের নাম শুনলেই সেসব অঞ্চলের খাবারের কথা মনে পড়ে। যেমন বগুড়ার ঐতিয্যবাহী দই, মুক্তাগাছার মণ্ডা, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, টাঙ্গাইলের চমচম ইত্যাদি। এসব নাম যেন দেশের প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। তেমনই জামালপুর ও শেরপুর জেলায় প্রচলিত ও বিখ্যাত খাবার রয়েছে। জেলার শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী খাবারের নাম ‘পিঠালি’ বা ‘মেন্দা’। অনেকেই আবার মেলানি বা মিলানি বা মিল্লি বলেও চিনে থাকে।
জামালপুরের চরাঞ্চলে শত বছর ধরে এই পিঠালের রেওয়াজ থাকলেও শেরপুর-জামালপুর জেলার সীমারেখা বরাবর চলাঞ্চলের মানুষের এ পিঠালির ব্যাপক জনপ্রিয় রয়েছে। যদিও এই পিঠারির উৎপত্তি তৎকালীন জামালপুর জেলায় হলেও (১৯৮৪ সাল পর্যন্ত শেরপুর জেলা জামালপুর জেলার সাথে ছিল ) বর্তমান শেরপুর জেলার চরাঞ্চল সহ শহরেও এর প্রচলন ও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
শেরপুর জেলার চলাঞ্চলের মধ্যে সদর উপজেলা ও শ্রীবরদী উপজেলায় এক সময় এর প্রচলন থাকলেও বর্তমানে এই পিঠালির প্রচলন শহরেও দেখা যাচ্ছে। আধুনিক যুগে তরুণ প্রজন্মের মেয়েরা ঘরে বসে ইউটিউব ঘেঁটে নানান রেসিপি বানাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তৈরি করা হচ্ছে নানা রকম বাহারি স্বাদের খাবার। তাই শত বছরের ঐতিহ্য অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে।
এমতাবস্থায় এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে স্থানীয়রা এই পিঠালি এক সময় শুধু উৎসবে পরিবেশন করলেও এখন অনেকেই বাণিজ্যিক ভাবে বিক্রি করছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শেরপুর শহরের গৌরীপুর মহল্লায় নিজামুল নামে এক ব্যক্তি এই পিঠালি তৈরি করে বিক্রি উদ্যোগ নেয়। এই এলাকায় প্রতি বছরই এভাবেই একদিন পাঠালি তৈরি করে বিক্রি করা হয়। শুক্রবার সকাল থেকেই মাইকিং করে প্রচার করা হয় ২০০ টাকা কেজি করে পিঠালি বিক্রির কথা। এই মাইকিং শুনে এলাকার মানুষ জুম্মার নামাজের পরে কিনে নেয় ঐতিহ্যবাহী খাবার পিঠালি।
পিঠালি কেবল মানুষের প্রতিদিনের খাবার নয়। এটি সাধারণত আকিকা, বিয়ে, মৃত্যুবার্ষিকী, খতনা, চল্লিশা/লিল্লা, নির্বাচনী প্রচারণাসহ বিশেষ সামাজিক অনুষ্ঠানে খাবার হিসেবে প্রচলিত রয়েছে। এই খাবার না থাকলে অনুষ্ঠানের প্রাণই থাকে না। তাই অনুষ্ঠানের আয়োজকরা পিঠালিকেই গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশন করেন। পিঠালি খাওয়ায় সবথেকে ভালো এবং এ অঞ্চলের প্রসিদ্ধ কোন অনুষ্ঠানে ধনী-গরিব সবাই মাটিতে বসে কলাপাতায় গরম ভাত আর সুস্বাদু পিঠালি খাওয়া। কলাপাতা ছাড়া অন্য পাত্রে পিঠালির প্রকৃত মজা পাওয়া যায় না। এলাকা ভেদে পিঠালির ভিন্ন নাম রয়েছে।
যেমন জামালপুর ও আশেপাশের এলাকায় স্বাধীনতার আগেও বিচার-সালিস বা বিয়ে বাড়িতে এই খাবার পরিবেশন করার রেওয়াজ ছিলো। তবে পিঠালিকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এ খাবার জামালপুর ও শেরপুর বাসীর সকলেরই প্রিয়। পিঠালি খেলেই শুধু বোঝা যায়, কেন এই পিঠালি নাম শুনলে জিভে পানি চলে আসে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, শত বছরের বেশি সময় ধরে এ অঞ্চলে পিঠালি প্রচলিত রয়েছে। ১৯৭১ সালের আগেও এই পিঠালির জনপ্রিয়তা ছিল অনেক। প্রতিটি উৎসবে খাবারের প্রধান আকর্ষণ ছিল পিঠালি। এখন আধুনিক যুগের নানা রেসিপির আওয়াজ থাকায় নতুন প্রজন্মের কাছে পিঠালি খুব একটা জনপ্রিয় নয়। তবে এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখে এখনো অনেকেই প্রতিবছর শীত মৌসুমে বিশেষ আয়োজন করে রান্নার মাধ্যমে বিক্রি করা হচ্ছে পিঠালি। জেলার শ্রীবরদী এবং সদর উপজেলার চরাঞ্চলের বেশ কিছু গ্রামের বাজারে এখনো সপ্তাহের হাটের দিন নির্ধারিত দু-একটি হোটেলে এই পিঠালি বিক্রি করা হয়।
পিঠালি তৈরির প্রধান উপকরণ গরুর মাংস, চালের গুঁড়া, পেঁয়াজ, রসুন, জিরাসহ প্রায় ১০ প্রকারের মসলা। সুস্বাদু এই খাবারের বিশেষত্ব হলো এটির নরম মাংস, চর্বি ও হাড়, ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে কলাপাতায় পরিবেশন।
পিঠালির আরেক বিশেষত্ব হলো ডাল-ভাতের মতো প্রতিদিনের খাবার নয়। এটি মূলত উৎসবের খাবার। পিঠালির প্রচলন কীভাবে বা এটি প্রথম চালু হয় কখন, এর সঠিক কোনো ইতিহাস না থাকলেও প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, আঠারো শতকের প্রথম দিকে জামালপুরের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জুড়ে টাঙ্গাইল এবং আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ এসে বিচ্ছিন্ন জনবসতি গড়ে তোলে। সে সময় ইংরেজ শাসনামলে গ্রাম্য সামাজিক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হতো। ধারণা করা যায়, সে সময়ে পিঠালি এক বিশেষ খাবার হিসেবে মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে।
পিঠালি তৈরির জন্য প্রথমেই দরকার হয় মাংসের। গরু, ছাগল, মহিষ বা মুরগির মাংস দিয়ে খুব সহজেই রান্না করা যায়। এ ক্ষেত্রে গরুর মাংস ভিন্ন স্বাদ এনে দেয়। মাঝারি বা বড় করে মাংস কেটে এরপর পাতিলে লবণ ও মরিচ দিয়ে সেটি সেদ্ধ করা হয়, এরপর চালের গুঁড়া দেওয়া হয় এবং পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মসলা যোগ করে বাগাড় দিতে হয়। এভাবে কিছু সময় পর তৈরি হয়ে যায় ধোঁয়া ওঠা লোভনীয় পিঠালির চেহারা। গরম পাতিলে পিঠালির ঘ্রাণ যেকোনো মানুষের জিবে জল এনে দিতে সক্ষম।


_medium_1772208260.jpg)




