শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় এলাকায় ভয়ংকর সব মাদকের নিরাপদ রুট
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৯ রাত

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেষা শেরপুরের গারো পাহাড়ের শান্ত শীতল ছায়াঘেরা জনপদ এখন ভয়ংকর সব মাদকের নিরাপদ রুট তৈরি হয়েছে। ফলে এই গারো পাহাড় এলাকায এখন এক মরণনেশার নীল দংশনে বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে।
জেলার নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ের দুর্গম পথগুলো ব্যবহার করে প্রতিদিন বাংলাদেশে ঢুকছে নিষিদ্ধ নানান মাদকের সাথে কোডিনযুক্ত সিরাপ এবং ট্যাপেন্টাডল ব্র্যান্ডের ট্যাবলেটের বড় বড় চালান। এসব মালামাল বড় বড় ব্র্যান্ডের আড়ালে এখন মূলত স্বল্পপরিচিত ও বেনামি কোম্পানিগুলোই এই অবৈধ পাচারের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার হলদীগ্রাম সীমান্ত থেকে ১ লাখ ৩ হাজার পিস ট্যাপেন্টাডল ব্র্যান্ডের ট্যাবলেট জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন (৩৯ বিজিবি)'র টহল দলের উদ্ধারকৃত এসব মাদকের বাজার মূল্য ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে জেলার ঝিনাইগাতী এবং নালিতাবাড়ী সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতীয় মদ, ফেনসিডিল, মরণ নেশার বিষাক্ত ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট আটক করা হয়। সেই সাথে এসব মাদক চলাচলের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে লাল চাঁন নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃত এসব মাদকের মূল্য প্রায় ১০ লক্ষ টাকা।
সম্প্রতি ৩৯ ব্যাটালিয়ন বিজিবি'র এক ব্রিফিং এ জানিয়েছেন, গারো পাহাড়ের এই অঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে ২০২৫ সালে প্রায় ৬০ কোটি টাকার মাদকসহ অবৈধ মালামাল জব্দ করা হয়েছে।
বিজিবি প্রায়ই ভারত থেকে এ সীমান্ত পথে অবৈধভাবে আসা বিভিন্ন মাদক উদ্ধার করে চলেছে। তারপরও থামছে না অযোগ অবৈধ মাদকের থাবা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা এই এলাকাগুলোতে গভীর রাতে যখন পাহাড় নিস্তব্ধ হয়ে যায় তখনই সক্রিয় হয়ে ওঠে পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। তারা মেঘালয়ের সাউথ গারো হিলস জেলার তুরা ও ঢালু এলাকার পাহাড়ি ঝিরিপথ আর ঘন জঙ্গলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কাঁটাতারের নজরদারি এড়িয়ে বস্তাভর্তি এই মরণনেশা লোকালয়ে নিয়ে আসে।
ভারতের অভ্যন্তরে এই সিরাপগুলোর যাত্রা শুরু হয় অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে। কারখানা থেকে সরাসরি এসব পণ্য বাজারে আসে না বরং শেল কোম্পানি বা নাম সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভুয়া ইনভয়েস তৈরি করে এগুলো সংগ্রহ করা হয়। পাচারকারীরা আল উকবা, এসবি ফার্মা বা সিং মেডিকোস এর মতো ভুয়া নাম ও জিএসটি নম্বর ব্যবহার করে ভারতের উত্তরপ্রদেশ থেকে হাজার হাজার কার্টুন সিরাপের অর্ডার দেয়। এরপর ট্রাকের ভেতরে ফল সবজি বা ইলেকট্রনিক্স পণ্যের আড়ালে বিশেষ ফলস বডি তৈরি করে এসব সিরাপ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং মেঘালয় সীমান্তের গুদামগুলোতে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে স্থানীয় ছোট ছোট ডিস্ট্রিবিউটরদের মাধ্যমে বোতলগুলো ভাগ হয়ে যায় এবং সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি গ্রামগুলোতে মজুত করা হয়।
ভারতের মেঘালয় সীমান্ত সংলগ্ন ঢালুর দোবাচিপাড়া ও বারাঙ্গাপাড়া এলাকা এখন এই মরণনেশার অন্যতম প্রধান ট্রানজিট। সেখানকার এক সরবরাহকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে নজরদারি এড়াতে তারা এখন বড় ব্র্যান্ডের বদলে বেনামি কোম্পানির সিরাপগুলো বেশি বিক্রি করছেন কারণ এগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয়ভাবে প্রতিটি বোতল ১০০ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও বর্ডার পার হলেই এর দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
শেরপুরের নাকুগাঁও, তাওয়াকুচা ও বনগাঁও সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এই সিরাপগুলো বাংলাদেশে প্রবেশের পর অত্যন্ত সুকৌশলে ইজিবাইক বা মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংকি ও সিটের নিচে লুকিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এসব মরণনেশাকে কোডিন বেজড কফ সিরাপ বা সিবিসিএস হিসেবে চিহ্নিত করছে। এই সিরাপগুলোর ভয়াবহতা কেবল নেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় এটি সরাসরি জীবন কেড়ে নিচ্ছে। কোডিন মূলত একটি শক্তিশালী ওপিওড ড্রাগ যা সেবনের পর লিভারে গিয়ে মরফিনে রূপান্তরিত হয় এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে মস্তিষ্কে সাময়িক আনন্দ তৈরি করে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তা করার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে কমিয়ে দেয়।
পাশাপাশি ল্যাবরেট বা স্রেসান ফার্মার মতো বিতর্কিত কোম্পানিগুলো খরচ কমাতে সিরাপে ভোজ্য গ্লিসারিনের বদলে ডাই ইথিলিন গ্লাইকল নামক মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক মেশায় যা সাধারণত গাড়ির ইঞ্জিনে অ্যান্টি ফ্রিজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি সেবনের ফলে দ্রুততম সময়ে একজন তরুণের কিডনি বিকল এবং স্নায়বিক পক্ষাঘাত হতে পারে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে যখন দেখা যায় আমাদের কিশোর ও স্কুলপড়ুয়া ছাত্ররা এই মরণনেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। কোনো গন্ধ না থাকায় এবং দেখতে সাধারণ সিরাপের মতো হওয়ায় অভিভাবকরা বুঝতেই পারছেন না তাদের সন্তান তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ অনুযায়ী এই সিরাপগুলো ক শ্রেণির মাদক এবং এর সামান্য পরিমাণ অবৈধ দখলও মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধ। কিন্তু শুধু কঠোর আইন দিয়ে এই ভয়াবহতা রোখা সম্ভব নয়।
জেলার সচেতন মহল মনে করছে শেরপুরের গারো পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি আর আমাদের আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে সীমান্ত এলাকায় পাহাড়সম সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি মা বাবাকে তাদের সন্তানের চলাফেরার ওপর কড়া নজর রাখতে হবে। সময় এসেছে একজোট হয়ে এই নীল দংশন থামানোর নতুবা আমাদের চোখের সামনেই ধ্বংস হয়ে যাবে একটি পুরো প্রজন্ম।
বিজিবি সূত্র জানায়, শেরপুরের সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতি উপজেলার হলদীগ্রাম সীমান্ত দিয়ে চোরাকারবারিরা অভিনব কৌশলে ভারতীয় ঔষধ পাচারের চেষ্টা করছে। এমন গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিজিবি'র টহল দল অভিযান পরিচালনা করে বিপুল পরিমান ভারতীয় ট্যাপেন্টাডল ব্র্যান্ডের ব্যাথানাশক ট্যাবলেট জব্দ করে। তবে বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা পালিয়ে যায়।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন (৩৯ বিজিবি) এর সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান চৌধুরী জানান, সীমান্তে মাদক, চোরাচালান এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধকল্পে বিজিবি'র কঠোর নীতি অনুসরণ করে আসছে এবং এই ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তারপরেও আমরা আগের চেয়ে আরও বেশি এলার্ট হয়ে কাজ করবো এবং আরো বেশি নজরদারি ও তৎপর হয়ে টহল বাড়ানো হবে।

_medium_1772208260.jpg)





