মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩২
শিরোনাম

শেরপুর সীমান্তে মাদক পাচারে ব্যবহার হচ্ছে ড্রোন


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ০২ মার্চ ২০২৬, ১২:৫০ দুপুর

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে শেরপুর জেলার তিনটি সীমান্ত উপজেলা। এই সীমান্ত উপজেলার মধ্যে শ্রীবরদীর মেঘাদল, ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া কিংবা নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও এলাকার সীমান্ত গ্রামগুলোতে সন্ধ্যা নামলেই এক রহস্যময় নিস্তব্ধতা নেমে আসে। গারো পাহাড়ের গহিন জঙ্গল আর কুয়াশার চাদরে ঢাকা এই পথগুলো এখন আর কেবল সাধারণ মানুষের চলাচলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান বলছে মাদক এখন আর কেবল মানুষের হাত ধরে কিংবা গরুর পেটে বেঁধে আসছে না। শেরপুর সীমান্ত এখন আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটগুলোর কাছে এক ‘টেক-ল্যাবরেটরি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে প্রযুক্তির কাছে হার মানছে প্রথাগত নজরদারি। 

বিশেষ করে গহীনগাঁও-তাওয়াকুচা গ্যাপ, হালচাটি গ্যাপ, ছোট গজনী ও আন্ধারিয়া, বড় টিলা ও ড্যাগার টিলা এবং খলচান্দা-সমেশ্চুড়া গ্যাপের মতো দুর্গম পয়েন্টগুলোতে কান পাতলে এখন শোনা যায় পাচারের নতুন সব কৌশলের গুঞ্জন। ভারতীয় সীমান্তে এই অঞ্চলে মাদক পাচারে বিশেষ করে নেশার সব ভয়ংকর ঔষধ পাচারে ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রোন।

ভারতের প্রভাবশালী প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা আইডিএসএ (IDSA) এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাচীনতম ইংরেজি দৈনিক ‘শিলং টাইমস’ (The Shillong Times)-এর বিভিন্ন সময়ের কৌশলগত বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন বলছে চোরাকারবারিরা এখন পাঞ্জাব সীমান্তের আদলে উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় সীমান্ত দিয়েও টেক-ট্রাফিকিং শুরু করেছে। বিশেষ করে জিপিএস নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ব্যবহার করে দুর্গম পাহাড়ে মাদকের প্যাকেট ড্রপ করার বিষয়টি এখন আর কেবল সিনেমাটিক কোনো গল্প নয়। যদিও শেরপুর সীমান্তে ড্রোনের ব্যবহারের কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি তবে ওপারে ভারতীয় অংশে এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এপারেও উচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।  

নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে হালচাটি খলচন্দা, আন্ধারিয়া এলাকার কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার  ভাষ্যমতে মাঝে মাঝে রাতের আকাশে মিটিমিটি জ্বলতে থাকা রহস্যময় আলো এই ড্রোনের উপস্থিতিরই জানান দেয়। উচ্চমূল্যের ভয়ংকর আইস বা ক্রিস্টাল মেথ পাচারে এখন এই এরিয়া রুট ব্যবহার করা হচ্ছে যা কোনো রাডারেও ধরা পড়ে না।

সীমান্তের এই বদলে যাওয়া চিত্র এবং প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে নিরাপত্তা ও সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (SSF)-এর সাবেক এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর মেজর মাহমুদুল হাসান (অবঃ) বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে শেরপুর বা নালিতাবাড়ী সীমান্ত দিয়ে যে চোরাচালান হচ্ছে তা দমনে আমাদের সনাতন পদ্ধতিগুলো এখন আর যথেষ্ট নয়। অপরাধীরা এখন অনেক বেশি চতুর এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত। মাদক পাচার রোধে আমাদের সীমান্তে এখন জ্যামিং সিস্টেম (Jamming System) এবং থার্মাল সার্ভেইল্যান্স (Thermal Surveillance) এর মতো আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো জরুরি। প্রতিটি বাহিনীর জন্য যেমন বিজিবি বা পুলিশের নিজস্ব বিশেষায়িত উইং থাকা দরকার তেমনি একটি ডেডিকেটেড কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা প্রয়োজন যা সরাসরি সীমান্ত রুটগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করবে। শুধুমাত্র যারা পণ্য বহন করছে তাদের ধরলে হবে না এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এবং যুবসমাজকে রক্ষা করতে একটি সমন্বিত ও স্মার্ট নজরদারি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।

একই বিষয়ে শেরপুর সীমান্তের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার সাথে কথা বললে তিনি জানান যে, তারা সীমান্ত সুরক্ষায় সর্বদা সজাগ আছেন। যদিও দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং বন্য হাতির উপদ্রব তাদের নিয়মিত টহল কাজে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে তবুও তারা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। ড্রোনের মাধ্যমে পাচারের বিষয়টি তারা অতি গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভবিষ্যতে জোরালো গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হবে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ কৌশল হলো ওয়াইল্ড শিল্ড বা বন্য হাতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। ভারতের ‘ইস্ট মোজো’ (EastMojo) এবং ‘নর্থ-ইস্ট নাউ’ (Northeast Now)-এর পাশাপাশি শিলং টাইমস-এর সীমান্ত অপরাধ বিষয়ক সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় মেঘালয় ও শেরপুর সীমান্তে বন্য হাতির উপদ্রবকেই পাচারকারীরা সুরক্ষা হিসেবে নিচ্ছে। 

সীমান্ত গ্রামগুলোর আদিবাসী বাঙালি মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যখন হাতির পাল লোকালয়ে নামে এবং নিরাপত্তাকর্মীরা টহল দিতে বাধাগ্রস্ত হন ঠিক সেই মুহূর্তটিকেই পাচারের মাহেন্দ্রক্ষণ হিসেবে বেছে নেয় সিন্ডিকেটগুলো। বিশেষ করে বড় টিলা এবং খলচান্দা-সমেশ্চুড়া গ্যাপের মতো এলাকাগুলোতে হাতির গতিবিধিকেই পাচারকারীরা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রকৃতি যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য প্রাণভয়ের কারণ অপরাধীরা সেটাকেই বানিয়ে নিয়েছে নিজেদের নিরাপদ করিডোর।

বর্ষা মৌসুমে এই কৌশলে যোগ হয় ওয়াটার বোর্ন ট্রাফিকিং বা জলপথ। ভারতের তুরা ও বাঘমারা এলাকা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ছড়া ও নদীগুলোর প্রবল স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া হয় বিশেষ ধরনের জলরোধী প্লাস্টিক ড্রাম। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে এই ড্রামগুলোতে জিপিএস ট্র্যাকার লাগানো থাকে ফলে ওপার থেকে ভেসে আসা মাদক ঠিক কোথায় পৌঁছাল তা ওপারে বসেই ট্র্যাকিং করা সম্ভব। এটি এতটাই নিখুঁত যে কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই সীমান্তের ওপার থেকে এপারে বড় বড় চালান ঢুকে পড়ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা গেটওয়ে হাউস-এর তথ্যমতে মিয়ানমারের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল থেকে আসা মাদক এখন মণিপুর ও মেঘালয় হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের একটি বিকল্প রুট তৈরি করেছে।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গণমাধ্যম The Shillong Times ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি প্রতিবেদনে শিরোনাম ছিলো- “BSF on high alert along Intl border in Garo Hills after drone sightings”. এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মেঘালয়ের সাউথ গারো হিলস জেলা (যা শেরপুরের নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী সীমান্তের ওপারে) এলাকায় ড্রোন উড়তে দেখা গেছে। বিএসএফ (BSF) সন্দেহ করছে যে এই ড্রোনগুলো মাদক বা অস্ত্র পাচারের রেকি (Recce) করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশের দৈনিক আজকের পত্রিকায় “মাদক পাচারে আধুনিক প্রযুক্তি: ৩২ জেলায় ডিনসি-র রেড অ্যালার্ট।” শিরোনামে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “পাচারকারীরা এখন আইস (Ice) বা ক্রিস্টাল মেথ পাচারে জিপিএস ট্র্যাকার এবং ড্রোনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর প্রেক্ষিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) শেরপুরসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ড্রোন বিধ্বংসী অ্যান্টি-ড্রোন গান ও থার্মাল ক্যামেরা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” 

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অনলাইন মিডিয়া ‘জাগো নিউজ’ এ “শেরপুর সীমান্তে বিজিবির বড় সাফল্য, বিপুল পরিমাণ ট্যাপেন্টাডল জব্দ।” শিরোনামে প্রতিবেদনে,” ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া ও নালিতাবাড়ীর নাকুগাঁও এলাকায় বিজিবির নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় নিষিদ্ধ ট্যাবলেট ও মদের চালান ধরা পড়ার তথ্য রয়েছে। যদিও প্রেস রিলিজে 'ড্রোন' বলা হয়নি, তবে "ভিন্নধর্মী ও দুর্গম রুট" ব্যবহারের কথা বিজিবি বারবার উল্লেখ করেছে।

এছাড়া থিংক-ট্যাঙ্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণী রিপোর্ট IDSA (Institute for Defence Studies and Analyses) - জুন, ২০২৪: রিপোর্ট: Technological Warfare in Drug Trafficking: Case of Indo-Bangla Border. বিশ্লেষণ: এই গবেষণাপত্রে দেখানো হয়েছে যে, পাঞ্জাব ও রাজস্থান সীমান্তের ড্রোন পাচার মডেল এখন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় (মণিপুর-মেঘালয়) সীমান্তে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

Gateway House - ডিসেম্বর, ২০২৫: রিপোর্ট: The Myanmar Connection: New Drug Trails to Bangladesh.

বিশ্লেষণ: মায়ানমারের মাদক কীভাবে মেঘালয়ের তুরা ও বাঘমারা হয়ে বাংলাদেশের শেরপুর ও নেত্রকোণা সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে তার ভৌগোলিক বিশ্লেষণ।

অনুসন্ধানের ভিত্তি: The Shillong Times: দক্ষিণ গারো পাহাড় সীমান্তে ড্রোনের গতিবিধি সংক্রান্ত বিশেষ রিপোর্ট (২০২৪-২৫)।

মাদকের এই ‘অদৃশ্য’ সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে সনাতন পদ্ধতির টহল এখন আর যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে শেরপুর সীমান্তের এই ভৌগোলিক জটিলতা মোকাবিলায় প্রয়োজন ‘স্মার্ট বর্ডার ম্যানেজমেন্ট’। বিশেষ করে হালচাটি গ্যাপ বা আন্ধারিয়ার মতো সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে ড্রোনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম এবং সিগন্যাল জ্যামার স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া দুর্গম পাহাড়ি এলাকা যেখানে মানুষের যাতায়াত সীমিত সেখানে থার্মাল সেন্সর ও নাইট ভিশন সার্ভেইল্যান্স ক্যামেরার নেটওয়ার্ক গড়ে তুললে বন্য হাতির উপদ্রব বা কুয়াশার মধ্যেও অপরাধীদের গতিবিধি শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মাদক রুটের এই ‘বিকল্প করিডোর’ বন্ধ করতে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর সাথে রিয়েল-টাইম গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান এবং জয়েন্ট টেকনিক্যাল সার্ভেইল্যান্স বাড়ানো জরুরি। ড্রোনের মাধ্যমে আসা মাদকের ডিজিটাল পেমেন্ট বা ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন ট্র্যাক করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সক্রিয়তাও এই চক্রের শিকড় উপড়ে ফেলতে সাহায্য করবে।

দিন বদলেছে তাই শুধু হাতে লাঠি আর টর্চলাইট নিয়ে এই আধুনিক পাচার ঠেকানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যখন প্রশাসন কেবল গরু বা মানুষের পকেটে মাদক খুঁজছে তখন অপরাধীরা ড্রোনের মাধ্যমে আকাশে কিংবা পাহাড়ি ঝর্নার স্রোতে ছড়িয়ে দিচ্ছে মরণ নেশার বিষ। গারো পাহাড়ের এই নিস্তব্ধতা অচিরেই যেন কোনো বড় জাতীয় ক্ষতির কারণ না হয়ে দাঁড়ায় সেজন্য এখনই ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স এবং আন্তঃসীমান্ত কঠোর গোয়েন্দা তৎপরতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সীমান্ত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। প্রযুক্তি যখন অপরাধের হাতিয়ার তখন প্রযুক্তি দিয়েই সেই জাল ছিঁড়ে ফেলা সম্ভব।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়ন (৩৯ বিজিবি) এর সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা নেই। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমে হালকা মাদক নামানো সম্ভব। এখন থেকে আমরা আরো তৎপর হবো অবৈধ মাদক ও চোরাচালার রোধে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত