শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২
শিরোনাম

শেষ বিদায়ে বেগম রোকেয়া'র প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও দাফনের সূচি ঘোষণা


  সুহাদা মেহজাবিন

প্রকাশ :  ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৪৬ দুপুর

নেত্রকোণার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি (এসইউএস)–এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক, কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক, মানবিক সমাজগঠনের এক অনন্য পথপ্রদর্শক এবং নেত্রকোনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষিকা বেগম রোকেয়া (মাস্তুরা আপা)–এর মরদেহ আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (শনিবার) সন্ধ্যায় সুইডেন থেকে বাংলাদেশে পৌঁছাবে।

তার শেষ বিদায় উপলক্ষে স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির উদ্যোগে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (রবিবার) শ্রদ্ধা নিবেদন ও দাফনসংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে সংগঠনের পক্ষ থেকে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ কামনা করা হয়েছে।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, সকাল ৭টা থেকে ৭টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত স্বাবলম্বী প্রাঙ্গণে প্রয়াত বেগম রোকেয়ার মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে। এরপর সকাল ৮টা থেকে ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠিত হবে।

পরবর্তীতে সকাল ৯টায় নেত্রকোনা চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।

জীবন ও কর্ম

প্রয়াত বেগম রোকেয়া ১৭ মে ১৯৪৭ সালে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের কাউরাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন বি.এ, বি.এড ডিগ্রিধারী সাবেক স্কুল শিক্ষিকা, মানবাধিকার কর্মী ও সমাজসংগঠক। শিক্ষাঙ্গনে তিনি সবার কাছে “মাস্তুরা আপা” নামে সুপরিচিত ছিলেন।

তিনি স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক ছাড়াও জাহানারা স্মৃতি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, নেত্রকোণা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

জন্ম ও পরিবার

তার পিতা আব্দুল আজিজ তালুকদার (মৃত্যু–১৯৭০) ছিলেন নেত্রকোনার একজন প্রতিষ্ঠিত পাট ব্যবসায়ী এবং মাতা রায়হানা বেগম (মৃত্যু–২০১৪) ছিলেন একজন আদর্শ গৃহিণী। তাঁদের বাসভবন ছিল নেত্রকোনার চন্দ্রনাথ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের সংসারে বেড়ে ওঠা বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয় সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন। তাঁর দাম্পত্য জীবন ছিল মাত্র সাত বছরের। তিনি দুই কন্যা সন্তানের জননী।

সংগ্রামী শিক্ষাজীবন

বিয়ের পর দীর্ঘ সাত বছর তিনি পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। পরে প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও সংগ্রামের মাধ্যমে আবার শিক্ষাজীবনে ফিরে আসেন। প্রাইভেট পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৬৯ সালে নেত্রকোনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং পরবর্তীতে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করে চাকরির পাশাপাশি তিনি বি.এ ও বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেন।

পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে তিনি ভাই-বোনদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে পরিবারের সব বোন উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং তাঁর দুই কন্যা মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

কর্মজীবন ও আন্তর্জাতিক ভূমিকা

তিনি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি থেকে অগ্রিম অবসর নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি, যা নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এনজিও কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তিনি বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশ সফর করেন। ১৯৮৩ সালে তাঁর প্রথম বিদেশ সফর ছিল ভারতের কলকাতা ও মাদ্রাজ এবং একই বছর শ্রীলঙ্কার কলম্বো। পরবর্তীতে এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে নারী উন্নয়ন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১০ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব মাইক্রোক্রেডিট সম্মেলনে তিনি অংশ নেন।

অবদান ও মূল্যায়ন

স্বাবলম্বী উন্নয়ন সমিতি প্রতিষ্ঠাকালে তিনি নেত্রকোণা শহরের প্রতিটি বিধবা ও অসহায় নারীর কাছে পৌঁছান এবং তাদের সংগঠিত করেন। এ কাজে তাকে নানা সামাজিক বাধা ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি এক শ্রেণির ধর্মীয় লেবাসধারী মানুষের বিরোধিতা ও মিছিলেরও সম্মুখীন হন। তবুও তিনি নারী অধিকার ও মানবিক সমাজ গঠনের সংগ্রাম থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে দাঁড়াননি।

দৈহিক মৃত্যু স্বাভাবিক হলেও বেগম রোকেয়া (মাস্তুরা আপা) যে আদর্শ ও কর্মধারা রেখে গেছেন, তা অসহায় ও সম্বলহীন নারীদের পথ দেখাবে বহুদিন। নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০–১৯৩২)–এর যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে নেত্রকোণার এই বেগম রোকেয়ার নাম ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত