শেরপুরে পরিবেশ বিপর্যয়ে হারিয়ে যাচ্ছে পানিফল
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৮ দুপুর

ক’দিন পরেই শুরু হচ্ছে শীতকাল। আশ্বিনের শেষ, কার্তিকের শুরু। বর্ষার পানি গা থেকে ঝেড়ে শেরপুরের বিভিন্ন খাল-বিলে উঁচু অংশ ভেসে উঠেছে। এসব খাল বিলে একসময় প্রচুর পানিফল পাওয়া গেলেও এখন আগের মত চোখে পড়ে না। তবে জেলার দু’একটি বিল এবং জেলার আশপাশে কিছু বিল থেকে এই পানি ফল এনে শহরের ঐতিহ্যবাহী ও পুরাতন পানি ফলের হাটে তা বিক্রি করে থাকেন পানিফল পাইকাররা।
পানি ফলের সেই শত বছরের পুরনো হাটটি হলো শেরপুর সরকারি কলেজের অনার্স গেট সংলগ্ন পৌর রাস্তার পাশেই। একসময় এখানে শতাধিক ব্যক্তি বস্তায় বস্তায় পানিফল এনে পাইকারি বিক্রি করলেও এখন হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র ওই পানিফল এনে বিক্রি করেন।
স্থানীয় বাগরাকশা মহল্লার বয়বৃদ্ধ রহমত আলী (৮০) বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি এই কলেজ মাঠের পাশে অনেক মানুষ বস্তায় বস্তায় পানিফল নিয়ে এসে পাইকারি বিক্রি করতো। ওই সময় আশপাশে বিভিন্ন দোকানে পিঁয়াজু, সিঙ্গারা, রুটি, গুলগুলি সহ বিভিন্ন খাবারের দোকানপাট বসতো। এখন সেই পানি ফলে হাটও নেই দোকানপাটও নেই। আশপাশে এখন বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শোরুম গড়ে উঠেছে। তবে এখনো প্রতিবছর অল্প কিছু মানুষ এই পানিফল এনে পাইকারি বিক্রি করে থাকে।
জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার পাইকুরা গ্রামের আব্দুল মালেক বলেন, আমি ১০-১২ বছর ধরে প্রতিবছর আমাদের এলাকার বিভিন্ন বিল থেকে এই পালিয়ে ফল সংগ্রহ করে এনে এখানে বিক্রি করে থাকি। খাল-বিল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে আগের মত আর পানি ফল পাই না।
শহরের নয়নী বাজার এলাকার খুচরা ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী বলেন, পানিফল আগের মত চলে না। তারপরেও যেহেতু কাঁচা সবজির ব্যবসা করি তাই মৌসুমের সময় এই পানি ফল বিক্রি করি। আমরা পাইকারি ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি নিয়ে আসি এবং বিক্রি করি ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি।
স্থানীয়দের সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরের বৈশা বিল (যা পদ্মবিল নামেও পরিচিত), রৌহা বিল, সাতপাকিয়া বিল, বাপাইল বিল, বাউলার বিল, মেদার বিল, কান্তাইল বিল, শোলমারা বিল ইত্যাদি বিলের একসময় প্রচুর এই পানিফল পাওয়া যেতো।
বিলগুলোতে শুধু পানিফল বা সিংরাই নয় বিলে ছিল আরো নানা জাতের জলজ ফলমূল ও শাকসবজি। এর মধ্যে শাপলা-শালুক, ওকল, মাখনা, ড্যাপ, কলমীশাক, সেঞ্চি, হেলেঞ্চা, মালঞ্চ অন্যতম।
বিল পাড়ের প্রবীণ লোকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ ও গুল্মলতায় ভরাট ছিল শেরপুরের প্রতিটি বিল ও জলাশয়। শীতকালে প্রতিটি বিল সিংরাসহ নানা প্রজাতির জলজ ফল, গুল্মলতায় ভরপুর থাকত। এসব দিলের মূল সম্পদ বলতে বিলে মাছ আর প্লাবন ভূমিতে (কৃষি) ফসলের চাষ। এর বাইরেও বহু সম্পদ রয়েছে যার ওপর নির্ভর করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী বেঁচে থাকে।
পরিবেশবাদী যুব সংগঠন গ্রীন ভয়েস এর সাধারণ সম্পাদক মারুফুর রহমান বলেন, এসব জলজ সম্পদগুলো দিন দিন নিঃশেষ হতে চলেছে। কারণ এসব জলাভূমি প্রতিনিয়ত বোরো ধানের জমিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ইজারাদাররা বিল শুকিয়ে মাছ ধরে। এছাড়া বর্ষাকালে উপর্যুপরি কারেন্টজাল ও বেড়জাল টানার কারণে এসব জলজ উদ্ভিদগুলো দিন দিন কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হচ্ছে একশ্রেণীর ভূমি দস্যু এসব বিল ভরাট করে কোথাও মৎস্য খামার, আবার কোথাও ভরাট করে বেদখল করে বাসা বাড়ি তৈরি করেছে। ফলে হতদরিদ্র শ্রেণির মানুষ এসব প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার থেকে ক্রমেই সরে পড়ছে।




_medium_1791802946.jpg)

_medium_1791802537.jpg)
