শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
শিরোনাম

সুর থামলো, পথ ফুরালো না, দায় রয়ে গেল- চারণ কবি হাছেন আলীর স্মরণে


  জাকির আহমদ খান কামাল

প্রকাশ :  ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৫ দুপুর

গত ৭ অক্টোবর নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলার আগিয়া ইউনিয়নের মহিষবেড় গ্রামে যে কণ্ঠটি চিরতরে থেমে গেল, সে কণ্ঠ কোনো মাইকে বাজতো না। সে কণ্ঠ বাজতো মানুষের উঠোনে, হাটের পাশে, চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে। পল্লী সমাজকর্মী ও চারণ কবি মোঃ হাছেন আলী [৭০] চলে গেলেন। কোনো ঢাক-ঢোল নেই, কোনো রাষ্ট্রীয় শোক নেই। যেমন নীরবে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে পুঁথি পাঠ করে বেড়াতেন, তেমনি নীরবেই তিনি চলে গেলেন। কিন্তু এই নীরব প্রস্থানটি আসলে এক বিরাট শব্দ করে গেল - বাংলাদেশের লোক-ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলো।

চারণ কারা? কেন তিনি শেষ প্রতিনিধি:

চর্যাপদের কাল থেকে শুরু। যখন কাগজ ছিল না, বই ছিল না, তখন জ্ঞান বাঁচিয়ে রাখতো মানুষের মুখ। গাজী-কালু-চম্পাবতী, ইউসুফ-জোলেখা, লাইলী-মজনুর পুঁথি কাঁধে নিয়ে একদল মানুষ গ্রামে গ্রামে ঘুরতো। তারা গান গাইতো, গল্প বলতো, নীতিকথা শোনাতো। তারাই ছিল বাংলার প্রথম সংবাদপত্র, প্রথম স্কুল, প্রথম আদালত। মাইক, প্রেস, ফেসবুক আসার আগে তারাই মানুষের বিবেক জাগাতো। আজ এই ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্ত। শহুরে গবেষকরা যখন একে জাদুঘরে খুঁজছেন, তখন মহিষবেড়ে বসে একজন মানুষ একা হাতে এই প্রদীপটি আগলে রেখেছিলেন। হাছেন আলী ছিলেন সেই শেষ প্রদীপের শেষ শিখা।

সমাজকর্মী থেকে কবি হয়ে ওঠা:

তাঁর পরিচয়পত্রে লেখা - পিতা মৃত মোঃ আরমান আলী, গ্রাম মহিষবেড়, ডাকঘর আগিয়া, উপজেলা পূর্বধলা, জেলা নেত্রকোণা। ২০০৬ সালে সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় তিনি এম.এন.পি ট্রেনিং প্রাপ্ত হন। দীর্ঘদিন তিনি এসইউএস এর সাথে পল্লী উন্নয়নে কাজ করেছেন। মাঠে কাজ করতে গিয়ে তিনি বুঝেছিলেন, মানুষকে শুধু ঋণ দিলে হবে না, মনের ভেতরে ঢুকতে হবে। আর বাঙালির মনের ভেতরে ঢোকার সবচেয়ে পুরনো চাবি হলো পুঁথির সুর। তাই তিনি আধুনিক উন্নয়নকর্মীর পাওয়ার পয়েন্ট ফেলে বেছে নিলেন গাজী-কালুর পুঁথির সুরকে। তাঁর প্রতিটি বইয়ের নিচে লেখা থাকতো - লেখক: পল্লী সমাজকর্মী ও চারণ কবি মোঃ হাছেন আলী। এই দুটি পরিচয়কে তিনি আলাদা করেননি।

তাঁর পুঁথি - বিনোদন নয়, সামাজিক দলিল:

আমরা তাঁর যে বইগুলো হাতে পেয়েছি, তার তালিকাই তাঁর চিন্তা বলে দেয়। তাঁর প্রকাশিত বইসমূহ - "অধিকারের কথা", "ঘূর্ণিঝড়ের কথা", "গ্রামীণ নারীর কথা" [১ম প্রকাশ ২০০৭, ২য় প্রকাশ ২০১৬], "অতীতের নির্বাচনের কথা", "নারীর অধিকারের কথা", "নিতাই বাবুর কন্যা লক্ষ্মী নারীর জীবনী", নেত্রকোণা জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি মোঃ মুশফিকুর রহমানের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের পুঁথি।

তাঁর দুটি শ্রেষ্ঠ কাজ : "অতীতের গ্রামীণ নারীর পুঁথি" ও "অতীত ও বর্তমান গ্রামীণ নারীর কথা"। প্রচ্ছদে একজন গ্রামীণ নারী কলসিতে পানি ঢালছে। এই ছবিটাই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি - নারী সংসারের ধারক।

তাঁর পুঁথি ছিল প্রতিবাদের হাতিয়ার। একটি বইয়ের শুরুতেই তিনি লিখেছেন - "আমার এই বইটি লেখার উদ্দেশ্য হল যৌতুক দেওয়া এবং নেওয়া যদি আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ হয়ে থাকে। তাহলে সমস্ত নারীদের পক্ষে এবং যৌতুক লোভী সমস্ত পুরুষ শাসিত সমাজের বিরুদ্ধে আমার এই উপস্থাপনা।"

আরেকটি বইতে তিনি "মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের কুফলের আংশিক বর্ণনা" দিয়েছেন ১৭ দফায় - অল্প বয়সে অধিক সন্তান, স্বাস্থ্য নষ্ট, অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত, একলামশিয়া রোগ, মাতৃ মৃত্যু বৃদ্ধি, সংসার গোছাতে না পারা, সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়া, তালাক বৃদ্ধি, সংসারে উন্নতি কম হওয়া, আত্মহত্যার প্রবণতা, পাগল হওয়ার প্রবণতা, রক্তশূন্যতা থেকে নানা রোগ। আজকের এনজিও রিপোর্টে যা থাকে, তিনি তা লিখেছেন পুঁথির ছন্দে।

মানবতার কবি:

হাছেন আলী ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। তিনি নিজে ধর্মপ্রাণ মুসলমান হয়েও লিখেছেন -

"অহিংসা পরম ধর্ম সর্ব শাস্ত্রে পাই, 

হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টান জাতের বিচার নাই।"

"কেহ বলে আল্লা আল্লা কেহ বলে হরি, 

নামায রোজা সেবা পূজা একি আশায় করি।"

তিনি হিন্দু চরিত্র নিতাই ঠাকুর ও তার মা-মরা মেয়ে লক্ষ্মী রাণীকে নিয়ে আস্ত জীবনী পুঁথি লিখেছেন। যেখানে লিখেছেন - "বড়ই দুঃখি লক্ষ্মী রাণী মা মরা সন্তান, 

লালন পালন বাবায় করে বাঁচায় ভগবান।" একজন মুসলমান চারণ কবির হাতে হিন্দু মেয়ের জীবনী - এটাই বাংলাদেশ।

তাঁর দর্শনের সারকথা ছিল:

"আমরা জানি একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি যেমন আর একজন ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগ্রত পারে না, তেমনি একজন মানুষ নিজে সচেতন না হইয়া আর একজন মানুষকে সচেতন করতে পারে না।" তাই তিনি নিজে সচেতন হয়ে গ্রাম জাগাতে বেরিয়েছিলেন।

আমরা কী হারালাম:

আমরা একজন কবিকে হারাইনি, একটি চলমান লাইব্রেরিকে হারিয়েছি। তাঁর বইগুলো ভূঁইয়া প্রিন্টার্স, নেত্রকোণা থেকে ছাপা, সাদামাটা কাগজে। কিন্তু এর ভেতরের তথ্য অমূল্য। যদি এখনই সংরক্ষণ না করা হয়, আগামী দশ বছরে কেউ জানবেই না পূর্বধলায় এমন একজন চারণ ছিলেন।

আমাদের দাবি:

পূর্বধলা উপজেলা প্রশাসন, নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন এবং বাংলা একাডেমির কাছে আমাদের দাবি - তার সমস্ত পুঁথি সংগ্রহ করে একটি ডিজিটাল আর্কাইভ করা হোক। নেত্রকোণার লোকসাহিত্য গবেষকদের উচিত তার জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা করা। তাঁর নিজ গ্রাম মহিষবেড়ে তাঁর নামে একটি পল্লী পাঠাগার স্থাপন করা।  

চারণরা মরে না। তারা মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে। যতদিন গ্রামে যৌতুকের জন্য কোনো নারী কাঁদবে, যতদিন বাল্যবিবাহের জন্য কোনো মেয়ের স্কুল বন্ধ হবে, ততদিন হাছেন আলীর পুঁথি প্রাসঙ্গিক থাকবে। তাঁর সুর থেমে গেছে, কিন্তু তিনি যে পথ দেখিয়ে গেছেন, সে পথ ফুরায়নি। বিনম্র শ্রদ্ধা, হে পল্লীর শেষ চারণ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত