ঐতিহাসিক পটভূমিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু: অধিবেশনে যা যা হলো
এ কে এম আজিজুর রহমান
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ১১:৪৯ রাত
_original_1757748225_medium_1773037639_original_1773337783.jpg)
দীর্ঘ পথচলা শেষে অবশেষে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫ মিনিটে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রথম অধিবেশনের মাধ্যমে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় । জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমিতে গঠিত এই সংসদের প্রথম দিনটি ছিল বর্ণিল ও তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ এবং একগুচ্ছ অধ্যাদেশ জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়।
স্পিকার পদে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল
প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই শূন্য পদটি পূরণের জন্য নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু স্পিকারের পদটি ফাঁকা ছিল, তাই হাউসের সিনিয়র সদস্য ডা. খন্দকার মোশাররফ হোসেন অস্থায়ী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন । প্রধানমন্ত্রী ও হাউসের নেতা তারিক রহমান তাকে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনীত করেছিলেন ।
এতে প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান বীর বিক্রম খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে স্পিকার পদে মনোনয়ন দিলে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে স্পিকার নির্বাচিত হন । এছাড়া নেত্রকোণা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার পদে মনোনয়ন দিলে তিনিও সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হন । নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবাবুদ্দিন নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করান ।
শপথ গ্রহণের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব শুরু করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান তার অভিনন্দন বক্তব্যে বলেন, "আজকের এই সংসদ বাংলাদেশের জনগণের সংসদ। স্পিকার এখন থেকে কোনো রাজনৈতিক দলের নন, তিনি গোটা সংসদের অভিভাবক।"
রাষ্ট্রপতির ভাষণ: একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান
দ্বিতীয় পর্বে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবাবুদ্দিন সংসদে ভাষণ দেন। তিনি সংসদ সদস্যদেশের প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, "টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় যদি না জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা যায়।"
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে সদ্য সমাপ্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩০টিরও বেশি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন ও তা অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন এবং বলেন, "হাজারও শহীদের রক্তের বিনিময়ে একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে।"
সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, "যদি সরকার ও বিরোধী দল ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করে, তাহলে জাতি দ্রুত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।"
বিরোধী দলের কৌশল: সংস্কারের দাবিতে অনড়
বিরোধী দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রথম দিন থেকেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগেই জামায়াতের সংসদ সদস্যরা হাউস থেকে ওয়াক আউট করেন । জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান এর আগে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে তারা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন চান এবং ডেপুটি স্পিকারের একটি পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার দাবি জানান ।
তবে বিরোধী দলের এই ওয়াকআউটকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক চর্চা হিসেবে দেখছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, "তারা নিয়ম মেনেই ওয়াক আউট করেছেন। এটা নতুন কিছু নয়, এটাও একটা গণতান্ত্রিক চর্চা।"
আজ্ঞাধীন অধ্যাদেশ ও সংসদীয় কমিটি
প্রথম দিনেই সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করে । আইনমন্ত্রী এসব অধ্যাদেশ হাউসে উপস্থাপন করেন। এছাড়া পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনও সংসদে তোলা হয় ।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো পরীক্ষা করার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই কমিটিতে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের সদস্যরা থাকবেন ।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সড়ক নির্দেশিকা
প্রথম অধিবেশন উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবন ও এর আশেপাশের এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি করা হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অস্ত্র বহন, সভা-সমাবেশ ও মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং যান চলাচলের জন্য বিকল্প পথ নির্দেশিকা জারি করে ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে। ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি ২০৯টি, জামায়াত ৬৮টি, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ৬টি এবং বাকিগুলো অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ।







