মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ২ ভাদ্র ১৪৩৩
শিরোনাম

শেরপুরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার তালপাতার হাতপাখা 


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৬ বিকাল

রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে কৃষকের কুঁড়েঘর, জমিদারবাড়ি থেকে সাধারণ মানুষের সংসার, সবখানেই ছিল হাতপাখার কদর। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে হারিয়ে যেতে বসেছে হাজার বছরের এই লোকঐতিহ্য। তবে এই আধুনিক সভ্যতা ও প্রযুক্তি নির্ভর সমাজে শেরপুর শহরের নিউ মার্কেটস্থ ‘বিপ্লবী বাবু রবি নিয়োগী সভাকক্ষে’ একটি তালপাতার হাতপাখা ব্যবহার করা হচ্ছে। এ সভাকক্ষের সদস্যরা বিদ্যুৎ না থাকলে ওই হাতপাখাটি এখনো অনায়াসে ব্যবহার করে যাচ্ছে।

ইতিহাস সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় উপমহাদেশে তালপাতা ও প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি হাতপাখার ব্যবহার দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রাচীন বাংলা, মগধ ও গৌড় অঞ্চলে তাল, খেজুর ও বাঁশের তৈরি হাতপাখা দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ছিল। পাল ও সেন আমলে রাজদরবার, বৌদ্ধ বিহার এবং হিন্দু মন্দিরে রাজা, গুরু ও অতিথিদের বাতাস করার জন্য হাতপাখা ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে সুলতানি ও মুঘল আমলেও রাজা-বাদশাহ, নবাব ও জমিদারদের দরবারে দাস-দাসীরা হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতেন। ধীরে ধীরে এটি অভিজাত সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।

বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে তালপাতার হাতপাখা ছিল শুধু গরম নিবারণের উপকরণ নয়, ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। একসময় নববধূকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর সময় খাট, আলমারি, কাঁথা-বালিশ, পিতলের তৈজসপত্রের পাশাপাশি একটি বা একাধিক নকশা করা তালপাতার হাতপাখাও দেওয়া হতো। অতিথি আপ্যায়ন, ধর্মীয় মাহফিল, ঈদগাহ, মসজিদ, মন্দির, গ্রামীণ সালিশ, পাঠশালা কিংবা কৃষকের মাঠের বিশ্রাম সব জায়গাতেই হাতপাখার ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রীষ্মের রাতগুলোতে পরিবারের একজন সদস্য অন্যদের বাতাস করতেন এই হাতপাখা দিয়ে, যা ছিল বাংলার পারিবারিক জীবনের এক চিরচেনা দৃশ্য।

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসের সেই শান্ত পল্লী গ্রাম কিংবা বিভূতি ভূষণের 'পথের পাঁচালী'র নিশ্চিন্তিপুরের দুপুর-সবখানেই কিন্তু জড়িয়ে ছিল এই তালপাতার পাখার মৃদু বাতাস। গ্রামের বধুটির আলতো হাতের ছোঁয়ায় এই পাখার বাতাস যেন হয়ে উঠতো এক অলিখিত ভালোবাসার ভাষা। ঘামে ভেজা কপালে মায়ের হাতের এই পাখার বাতাস ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দামি এবং শান্তির স্পর্শ। 

তালপাতার হাতপাখা তৈরির প্রক্রিয়াও এক ধরনের লোকশিল্প। পরিপক্ব তালপাতা সংগ্রহ করে প্রথমে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়। এরপর পাতাগুলো সমান করে কেটে বাঁশ বা বেতের চিকন কাঠামোর সঙ্গে নিখুঁতভাবে বসানো হয়। শক্ত সুতা দিয়ে চারপাশ সেলাই করে বিভিন্ন নকশা তৈরি করা হয়। সবশেষে বাঁশ বা কাঠের হাতল লাগিয়ে তৈরি হয় একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব হাতপাখা। প্রতিটি পাখা তৈরিতে প্রয়োজন হয় ধৈর্য, অভিজ্ঞতা ও দক্ষ হাতের ছোঁয়া।

একসময় শেরপুরের গ্রামাঞ্চলের অনেক পরিবার এই হাতপাখা তৈরি করে সংসারের বাড়তি আয় করত। স্থানীয় হাট-বাজার, বিভিন্ন মেলা এবং বিয়ের অনুষ্ঠানে এসব পাখার ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ, জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক পাখা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারে সেই চাহিদা এখন প্রায় বিলীন। ফলে একের পর এক কারিগর এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। 

লোকসংস্কৃতি সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তালপাতার হাতপাখা আবারও দেশীয় হস্তশিল্প হিসেবে নতুন পরিচয় পেতে পারে। অন্যথায় বাংলার হাজার বছরের এই ঐতিহ্য অচিরেই শুধু বইয়ের পাতায় আর স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শেরপুর শহরের ডাঃ সেকান্দর আলী কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক মোঃ শওকত হোসেন বলেন, গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে যখন লোডশেডিং এর অন্ধকার ঘরটায় দম আটকে আসতো, তখন দাদি কিংবা মায়ের হাতে ওই একটা জিনিসেই মিলত স্বর্গীয় স্বস্তি। যেটি তালপাতার পাখা। বর্তমান যুগে ফেসবুকের স্ক্রল করতে করতে কিংবা এসির হিমশীতল বাতাসে আমরা হয়তো ভুলে গেছি এই অতি সাধারণ, অথচ পরম তৃপ্তির বস্তুটিকে। 

তালপাতার ইতিহাস শুধু বাতাস খাওয়ার নয়, এ তো আমাদের ঐতিহ্যের এক আদিম দলিল। প্রাচীন বাংলায় যখন কাগজ আবিষ্কৃত হয়নি, তখন ঋষি ও পন্ডিতেরা  মনের ভাব লিখে রাখতেন এই তাল পাতাতেই, যা 'তালপত্র' নামে পরিচিত ছিল। সেই লেখার পাতা কখন যে বাঙালির ঘরের দাওয়ায় তপ্ত দুপুরের ক্লান্তি হরণের সঙ্গী হয়ে উঠল, তা এক পরম বিস্ময়। বাংলার লোকশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন এই পাখা। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত