বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬, ১৭ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম

শেরপুরে স্বাস্থ্য বিভাগে বহাল তবিয়তে সাবেক স্বাচিপ নেতৃবৃন্দরা 


  রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ :  ০১ জুলাই ২০২৬, ০১:১০ রাত

২০২৪ এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে সংস্কারের জোর দাবি উঠলেও শেরপুর জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থনকারী স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ বা স্বাচিপ নেতৃবৃন্দ অনেকেই বহাল তবিয়তে রয়েছে। ওইসব স্বাচিপ নেতৃবৃন্দের অনেকেই স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন অফিসে সদর্পে তাদের কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, ২০১৮ সালে শেরপুর জেলা হাসপাতাল মিলনায়তনে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেই কমিটির প্রভাবশালী চিকিৎসকদের কেউ কেউ এখনো আগের মতোই একচ্ছত্রভাবে বজায় রয়েছে। 

২০২৪ সালের স্বাচিপ এর সর্বশেষ কমিটি গঠনের লক্ষ্যে একটি খসড়া তালিকা তৈরি হলেও ৫ আগস্টের পর সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

সূত্র মতে, জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্রে ২০১৮ সালের সেই স্বাচিপ কমিটির শীর্ষ নেতারাই একটি অলিখিত জোট তৈরি করে নীতি-নির্ধারণী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলো শক্তভাবে ধরে রেখেছেন।

অনুসন্ধানে ও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, এই পুরো সিন্ডিকেটের মূল চালিকাশক্তি ও নেপথ্য নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেলার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেলিম মিয়া। তিনি মূলত ২০১৮ সালে গঠিত হওয়া স্বাচিপ জেলা শাখার নির্বাহী কমিটির অন্যতম শীর্ষনেতা ও সদস্য ছিলেন। হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার দরপত্র, কেনাকাটা, ঔষধ বণ্টন এবং আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আর্থিক সংশ্লেষযুক্ত বিষয়গুলো সরাসরি তাঁরই তত্ত্বাবধানে ও নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে। 

ডা. সেলিম মিয়া ২০২৪ সালের ১৭ নভেম্বর স্থানীয় সময় টিভির সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে জেলার সর্বস্তরের সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। ওই সময়ে তাঁর অপসারণ ও শাস্তির দাবিতে এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ-মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। গণরোষের মুখে তিনি কিছুদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ও পলাতক অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পুনরায় আবির্ভূত হন।

ওই স্বাচিপ সিন্ডিকেট‌ পরিকল্পিত ভাবে বর্তমানে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যহত এবং ওষুধ ও জনবল সংকটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে হাসপাতালের ভেতরের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

ডা. সেলিম মিয়ার এই প্রভাব বলয়ের অন্যতম সহযোগী স্বাচিপের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মো. মোবারক হোসেন। বিগত সরকারের সময় ডাঃ মোবারক হোসেন ছিলেন সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার। বর্তমানে রয়েছে জেলা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার হিসেবে। 

একই সিন্ডিকেটের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও নীতিনির্ধারক হিসেবে কাজ করছেন ওই কমিটির সহ-সভাপতি ডা. পীযূষ চন্দ্র সূত্রধর এবং স্বাচিপের জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ডা. নাহিদ কামাল কেয়া। ডাক্তার কেয়া পতিত সরকারের সময় জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এর দায়িত্বকালীন সময় তার বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বাণিজ্যের ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে। ডাক্তার কেয়ার মা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ছিলেন। সে কারণে তার বেশ দাপট ছিল। তার মা শামসুন্নাহার কামাল ৫ আগস্টের পর থেকে পালিয়ে রয়েছেন।

এ বিষয়ে ডাক্তার কেয়া বলেন, ১৮ সালের কমিটির পরে আমাকে আর স্বাচিপ কমিটিতে রাখেনি। আর আমিও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। আমার মায়ের সাথে আওয়ামী লীগের সাবেক স্থানীয় এমপি ও হুইপ আতিউর রহমান আতিকের দ্বন্দ্বের কারণে আমাকেও কোনঠাসা করে রেখেছিল। এছাড়া তৎকালে হাসপাতালের সার্টিফিকেট বাণিজ্যের কথাও তিনি অস্বীকার করেন।

হাসপাতালের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দলীয় নেটওয়ার্ক ও পূর্বের রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ডা. সেলিম মিয়ার নেতৃত্বে এই চক্রটি নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে, যার ফলে সাধারণ চিকিৎসকদের একাংশ এবং কর্মচারীরা তটস্থ থাকেন।

এ বিষয়ে সাবেক স্বাচিপ নেতা ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সেলিম মিয়া বলেন, ওই সময় যারা সরকারি চাকরি করতেন তাদেরকে স্বাচিপের সদস্য হতে বাধ্য করা হতো। তাই আমাকে সদস্য করা হয়েছিল। তবে ওই কমিটির পর থেকে আমার স্বাচিপের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেই। এছাড়া তিনি হাসপাতালের নানা দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত