গারো পাহাড়ে থামছে না অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন-হুমকির মুখে পরিবেশ
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০৬:১২ বিকাল

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড় এলাকার বিভিন্ন নদী, ঝরণা, ছড়া বা ঝোড়া থেকে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসন ও বন বিভাগের অভিযান সত্ত্বেও প্রভাবশালী একটি চক্র দিনে ও রাতের আঁধারে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ি পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও বনাঞ্চল হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের বনরানী, দরবেশতলা, মালিটিলা ও হালচাটি এলাকাসহ গারো পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানের ছড়া বা ঝোড়া থেকে দীর্ঘদিন ধরে বালু এবং ছোট ছোট পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জড়িত ব্যক্তিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে সাহস পান না।
২৪ জুন মঙ্গলবার বিকেলে স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, কাংশা ইউনিয়নের দরবেশতলা এলাকায় কালঘোষা নদী থেকে কমপক্ষে ১০ জনকে বালু উত্তোলন করতে দেখা যায়। এছাড়া বনরানী রিসোর্ট এর পিছনে একটি পাহাড়ি ঝরণা থেকেও দুই-তিনজনকে বালু উত্তোলনে ব্যস্ত দেখা যায়। এ সময় স্থানীয়দের উপস্থিতি টের পেয়ে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা দ্রুত সরে যান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের কারণে কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও প্রায় এক সপ্তাহ ধরে আবারও বালু উত্তোলন শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তার আলী অভিযোগ করে বলেন, এভাবে প্রকাশ্যে বালু ও পাথর উত্তোলন হওয়ার পেছনে বনবিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নীরব ভূমিকা থাকতে পারে। না হলে দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রম চলতে পারত না। অপর একটি সূত্র জানায়, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক মহল এর সাথেও জড়িত থাকতে পারে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বন বিভাগের গজনী বিট কর্মকর্তা মো. সালেহীন নেওয়াজ খান। তিনি বলেন, বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এ কাজে জড়িত নন। অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, গত সোমবার ভোরে গজনী এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু পরিবহনের সময় মাহিন্দ্র ট্রাক্টরচালিত ছয়টি মিনি ট্রাক জব্দ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৪ জুন রাতে ট্রাকসহ বালু আটক এর ঘটনায় গজনী বিট কর্মকর্তা সালেহীন নেওয়াজ সহ এক বন রক্ষীর উপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করেছিল স্থানীয় ভালো দস্যুর। পরে ওই ঘটনায় ৭ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হলে তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও প্রধান আসামীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
শেরপুর বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং প্রকৃতি ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘শাইন্’ -এর নির্বাহী পরিচালক মো. মুগনিউর রহমান মনি জানান, নির্বিচারে ও অপরিকল্পিত বালু, পাথর উত্তোলন এবং গাছ কাটার ফলে গারো পাহাড়ের প্রতিবেশ ব্যাবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। এতে করে মানুষ ও পশু-পাখিসহ পরিবেশগতভাবে কেউই এই ক্ষতির হাত থেকে রেহাই পাবে না। প্রকৃতিকে তার নিজের নিয়মে চলতে দিতে হবে। তাই এখনই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়াতে হবে সেই সাথে গণসচেতনতা তৈরিতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
রাংটিয়া রেঞ্জ এর সহকারী বন সংরক্ষক তানভীর আহমেদ ইমন বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তারপরও যদি বালু উত্তোলন চলে তাহলে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে নিয়ে সচেতনতা মূলক কর্মসূচি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল আমীন বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর পাওয়া মাত্রই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও কারাদণ্ড, কোথাও অর্থদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ড্রেজার মেশিন জব্দ ও পাইপলাইন ধ্বংস করা হচ্ছে। এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও চলবে।




_medium_1782298420.jpg)


