শেরপুর সীমান্তের পাহাড় ও বন ধ্বংসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ১০:২২ রাত

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তঘেঁষা শেরপুর জেলার পাহাড়ি জনপদ ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী উপজেলা ও শ্রীবরদী উপজেলা জুড়ে চলমান বন উজাড় ও পাহাড় ধ্বংসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তবর্তী পাহাড়ি বনাঞ্চলে অবৈধভাবে গাছ কাটা, পাহাড় ধ্বংস, বনভূমি দখল এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে স্থানীয় সচেতন নাগরিক, পরিবেশকর্মী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
বৃহস্পতিবার ৭ মে দুপুরে সীমান্ত এলাকার রাংটিয়া রেঞ্জ কার্যালয়র সামনে ঝিনাইগাতী সম্মিলিত সচেতন সমাজের আয়োজনে এ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এতে বিভিন্ন পরিবেশবাদী, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী, তরুণ সমাজ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অংশগ্রহণ করেন।
সমাবেশস্থলে পরিবেশ রক্ষার দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয় এবং পাহাড় ও বন ধ্বংস বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা জানান, এক সময় শেরপুর সীমান্তের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল ঘন বনভূমি, বন্যপ্রাণী এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর ছিল। বিশেষ করে ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদীর পাহাড়ি এলাকাগুলো দেশের অন্যতম জীববৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু কয়েক দশক ধরে অব্যাহত বন উজাড়, পাহাড় কাটা এবং অবৈধ দখলের কারণে সেই প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়েছে।
সমাবেশে আরো বলা হয়, বন ধ্বংসের ফলে শুধু গাছপালাই হারিয়ে যাচ্ছে না, বিলীন হয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলও। একসময় যেসব পাহাড়ি বনাঞ্চলে হাতি, বানর, হরিণ, শিয়াল, বনমোরগ এবং নানা প্রজাতির পাখির বিচরণ ছিল, বর্তমানে সেসব এলাকায় জীববৈচিত্র্য দ্রুত কমে যাচ্ছে। বন সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণী লোকালয়ের দিকে চলে আসছে এবং বাড়ছে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত।
পরিবেশকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সীমান্তের পাহাড়ি বনাঞ্চল ধ্বংস হতে থাকলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্থানীয়ভাবে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি মাটির ক্ষয়, খরা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বনভূমি উজাড় অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ভয়াবহ পরিবেশ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে বলেও মত দেন তারা।
সমাবেশ থেকে বনখেকোদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে অবৈধ বন উজাড়, পাহাড় ধ্বংস এবং বনভূমি দখলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
আলোচনায় আরও উঠে আসে, শেরপুর সীমান্তের পাহাড়ি অঞ্চল শুধু পরিবেশগত দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চলও। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। কিন্তু অব্যাহত বন ধ্বংস চলতে থাকলে এ অঞ্চলের সৌন্দর্য, পরিবেশ এবং পর্যটন সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হয়।
সমাবেশে অংশগ্রহণ করে ‘সেভ দ্যা ওয়াইল্ডলাইফ এন্ড নেচার’, ‘সবুজ আন্দোলন বাংলাদেশ’, শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটি ঝিনাইগাতী, ‘বিউটি অফ ঝিনাইগাতী’, ‘হাতির খবর ও সচেতনতা’, ‘রক্তসৈনিক সংস্থা শ্রীবরদী’, ‘বন্ধু ফাউন্ডেশন’, ‘প্রশাখা’, ‘নালিতাবাড়ি থেকে যা কিছু দেখেছি’ এবং ‘ঝিনাইগাতী থেকে যা কিছু দেখেছি’ সহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।
সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা পাহাড় ও বন রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সীমান্তের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, প্রকৃতি রক্ষা করা গেলে পরিবেশ বাঁচবে, আর পরিবেশ বাঁচলে টিকে থাকবে মানুষ ও জীববৈচিত্র্য।







