বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম

ধর্ষণের বিচার কি সালিশে হয়? নীরবতার সংস্কৃতি ও সমাজের বিপজ্জনক বাস্তবতা


  আরবান ডেস্ক

প্রকাশ :  ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০২ দুপুর

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বহু সামাজিক বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা ছোটখাটো অপরাধের নিষ্পত্তি স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে হয়ে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ধর্ষণের মতো একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের বিচার কি সালিশে হতে পারে?

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত একটি ঘটনায় দেখা গেছে, ধর্ষণের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়েছে। সেখানে জরিমানা, ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা এলাকা ছাড়ার মতো সিদ্ধান্তের কথা সামনে এসেছে। কিন্তু আইনের চোখে এসব কোনো বিচার নয়। ধর্ষণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধ। এর বিচার করার এখতিয়ার কেবল আদালতের, কোনো গ্রামের সালিশ বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের নয়।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, ঘটনাটি যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে না পড়ত, যদি গণমাধ্যমের নজরে না আসত, যদি ভুক্তভোগী কিংবা তার পরিবার চুপ করে যেতে বাধ্য হতো—তাহলে কী হতো?

সম্ভবত ঘটনাটি স্থানীয় আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কয়েকজন মাতব্বরের বৈঠক বসত, কিছু অর্থের বিনিময় হতো, কোনো আপসনামা তৈরি হতো, আর একসময় বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যেত। ভুক্তভোগীকে বয়ে বেড়াতে হতো আজীবনের মানসিক ক্ষত, আর অভিযুক্ত ব্যক্তি হয়তো সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যেত। এটাই আমাদের সমাজের একটি কঠিন বাস্তবতা।

ধর্ষণের মতো অপরাধকে সালিশে নিষ্পত্তির চেষ্টা শুধু আইনের অবমাননাই নয়, এটি ভবিষ্যৎ অপরাধের পথও সহজ করে দেয়। যখন অপরাধী দেখে যে প্রভাব, অর্থ বা সামাজিক অবস্থান ব্যবহার করে আইনের হাত এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, তখন অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বেড়ে যায়। অন্যদিকে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে সালিশের নামে ভুক্তভোগীকেই সামাজিক চাপে ফেলা হয়। পরিবারের সম্মান, সামাজিক মর্যাদা কিংবা বিয়ের ভবিষ্যৎ দেখিয়ে মামলা না করার জন্য বোঝানো হয়। ফলে অপরাধের বিচার নয়, বরং ঘটনাটি গোপন রাখাই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য।

একটি সভ্য ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে ধর্ষণের বিচার কখনোই সালিশের টেবিলে হতে পারে না। এটি তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং আদালতের রায়ের বিষয়। স্থানীয় সালিশের কাজ হতে পারে সামাজিক বিরোধ মীমাংসা করা, কিন্তু ফৌজদারি অপরাধের বিচার করা নয়।

সাম্প্রতিক আলোচিত ঘটনাগুলো আমাদের সামনে আবারও সেই পুরোনো প্রশ্ন তুলে ধরেছে—আমরা কি অপরাধের বিচার চাই, নাকি অপরাধকে আড়াল করার উপায় খুঁজি? যদি কোনো ঘটনা প্রকাশ্যে না আসে, তাহলে কি সত্যিই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়?

সমাজের প্রতিটি সচেতন মানুষের দায়িত্ব হলো এমন অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, তাকে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়। কারণ নীরবতা কখনো ন্যায়বিচার আনে না; বরং অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। ধর্ষণের বিচার সালিশে নয়, আইনের আদালতেই হতে হবে—এটাই ন্যায়বিচারের মৌলিক দাবি।

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত