প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তবুও বিজ্ঞানী
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৫ রাত

কোনো আধুনিক গবেষণাগার নেই, নেই উন্নত যন্ত্রপাতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার সুযোগ। তবু নিজের সীমিত সামর্থ্য ও অদম্য আগ্রহকে পুজি করে ২১ বছর ধরে ধানের নতুন জাত উদ্ভাবন এবং হারিয়ে যেতে বসা দেশি ধান সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কৃষক সেন্টু চন্দ্র হাজং। নিজের মাত্র ১২ কাঠা জমিতে ৪৪০টি পরীক্ষামূলক প্লট তৈরি করে এ পর্যন্ত ২৫টি ধানের জাত উদ্ভাবনের দাবি করেছেন তিনি। তার উদ্ভাবিত ধান চাষ করে উপকৃত হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তবে দীর্ঘদিনের এই উদ্যোগের পরও উদ্ভাবিত জাতগুলোর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সরকারি বিশেষ সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল ইউনিয়নের চাটকিয়া গ্রামের বাসিন্দা সেন্টু চন্দ্র হাজংয়ের বয়স ৫৫ বছর। কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা সেন্টু এসএসসি পাসের পর অর্থাভাবে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ বন্ধ হলেও নতুন কিছু করার আগ্রহ হারাননি। সেই আগ্রহ থেকেই ধানের জাত নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণায় যুক্ত হন তিনি। বর্তমানে নিজের বসতঘরের পাশের জমিতেই চলছে তার গবেষণা।
স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে ২০০৫ সালে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ধানের জাত নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেন সেন্টু। নতুন জাত উদ্ভাবনে তিনি সংকরায়ণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন। একটি জাত উদ্ভাবন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং এর উপযোগিতা যাচাই করতে কখনো কখনো সাত থেকে আট বছর সময় লেগে যায়। কোনো পরীক্ষা ব্যর্থ হলেও দমে যান না তিনি। নতুন উদ্যমে শুরু করেন পরবর্তী পরীক্ষা।
তার উদ্ভাবিত জাতগুলো সেন্টু-১ থেকে সেন্টু-২৫ পর্যন্ত পরিচিত। এসবের মধ্যে সেন্টু শাইল, পাচ ধরনের সেন্টু পাইজাম, তিন ধরনের চিনি শাইল ও তুলশিমালা উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয় কৃষক করিম মিয়া বলেন, আমি দেড় একর জমিতে সেন্টু পাইজাম ধান রোপন করেছি। এ ধানের ফলন ভালো, ভাতও খেতে সুস্বাদু। এ কারণে প্রতিবছরই আমি এই ধান চাষ করি।
সেন্টু হাজং নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা দেশি ধানের জাত সংরক্ষণেও কাজ করছেন। নিজের জমিতে প্রতিবছর বগি, হালই, গোলাপী, মালঞ্চি, ময়নাগিড়ি, মালসিরা, অনামিয়া, পারিজাত, আপচি, কাইশাবিন্নি, মারাক্কাবিন্নি, শংবিন্নি, দুধবিন্নি, বিরই, চাপাল ও খাসিয়াবিন্নিসহ বিভিন্ন দেশি জাতের ধান পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করেন তিনি। বর্তমানে ঢেপা, চাপাল, পুরাবিন্নি ও নেদরাবিন্নিসহ আরও কয়েকটি জাত নিয়ে গবেষণা করছেন।
ধান চাষে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে গোবর ও নিজস্বভাবে তৈরি কেচো কম্পোস্ট ব্যবহার করেন তিনি। সেন্টুর মতে, দেশি ধানের অনেক জাত হারিয়ে যাওয়ার ঝুকিতে রয়েছে। অথচ এসব ধানের রয়েছে স্বতন্ত্র স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য।
এ বিষয়ে সেন্টু চন্দ্র হাজং বলেন, দেশি ধানের অনেক জাত হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ এসব ধানের স্বাদ ও বৈশিষ্ট্য আলাদা। আমি চাই, হারিয়ে যাওয়া জাতগুলো সংরক্ষণের পাশাপাশি আরও নতুন জাত উদ্ভাবন করতে। কিন্তু আমার কোনো গবেষণাগার নেই, আধুনিক যন্ত্রপাতিও নেই। নিজের ভাঙা ঘরে বসেই এসব কাজ করে যাচ্ছি। উদ্ভাবিত ধানের বীজের প্রত্যয়ন না পাওয়ায় প্যাকেটজাত করে বাজারে বিক্রি করতে পারছি না। সরকারিভাবে একটি গবেষণাগার ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে আমার গবেষণার ফলাফল আরও ভালোভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে নালিতাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, কৃষক সেন্টু হাজং দেশি ধানের জাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছেন। উপজেলা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন সম্প্রতি সরেজমিনে সেন্টু হাজংয়ের বাড়িতে গিয়ে তার উদ্ভাবনী কাজ পরিদর্শন করে বলেন, তার এই উদ্ভাবনের বিষয়ে সরকারকে আমি জানাবো, আশা করি তিনি স্বীকৃতি পাবেন। যতটুকু জেনেছি সেন্টু বাবুর ধান শুধু শেরপুরই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে চাষাবাদ করা হচ্ছে।




_medium_1793113825.jpg)


