দশ গুন বেশি রুগী নিয়ে ভারাক্রান্ত শেরপুর জেলা হাসপাতাল
রফিক মজিদ, শেরপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩০ দুপুর
_original_1793007011.jpg)
দেশের সিমান্তবর্তী জেলা শেরপুরের ৫ উপজেলার প্রায় ১৬ লাখসহ কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজিবপুর, জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ এবং ময়মনসিংহের ফুলপুর ও হালুয়াঘাট উপজেলার কিছু অংশের আরো প্রায় চার লক্ষাধিক সহ প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ কেবলমাত্র কাগজে-কলমে ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে।
কাগজে-কলমে এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ২৫০ টি হলেও এখনো সেই আট বছর পূর্বে ঘোষণা দেওয়ার পরও এখানে লোকবল ও সয্যা সংখ্যা রয়েছে মাত্র ১০০ জনের।
জেলার বাইরের উল্লেখিত জেলা-উপজেলা থেকে অতিরিক্ত রোগী আসার কারণে এখানে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার দুই শত রোগী ভর্তি থাকছে। ফলে দশগুণ বেশি রোগী নিয়ে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে এই হাসপাতাল এর চিকিৎসা সেবা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন সরকার শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করেন। কিন্তু উদ্বোধন ৮ বছর অতিবাহিত হলেও হাসপাতালটির শূন্য পদে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ সংকট, দালালদের দৌরাত্ব, যন্ত্রাদী বিকল, কৃর্তপক্ষের আন্তরিক সেবা না দেয়ার মানসিকতাসহ নানা কারণে যথাযথ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এ জেলাসহ আরো প্রায় তিনটি জেলার মানুষ।
ফলে হাসপাতালে এসে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। সরকারি হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে অনেকেই ছুটছেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে।
শেরপুর সদর হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে হাসপাতালে ৮৬ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৬ জন। এর মধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আছেন দুইজন। বাকি চিকিৎসকের পদই শূন্য। চিকিৎসকদের ৫৮ পদের মধ্যে সিনিয়র কনসালটেন্ট ১০টির নয়টি শূন্য, জুনিয়র কনসালটেন্ট ১৩টির মধ্যে ৮টি, আর এস পদে একটির মধ্যে ১টি এবং অ্যানেসথেটিস্ট তিনটি পদের মধ্যে একটি শূন্য।
এছাড়া একটি রেডিওলজিস্ট পদের মধ্যে একটিই শূন্য, চারটি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে একটি, রেজিস্ট্রার ৯টি পদের মধ্যে পাচটি পদই শূন্য রয়েছে।এদিকে ৮৭ জন নার্সের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৭৮ জন। বাকি পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য অবস্থায় আছে।
সূত্র মতে, ১৯৮৪ সালে সীমান্তবর্তী অঞ্চল শেরপুরকে জেলায় উন্নীত করা হয়। তখনও জেলা সদর হাসপাতালটি ছিল ৫০ শয্যার। জেলা উন্নীত হওয়ার কিছুদিন পর হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত হলেও রাজস্ব খাতে ছিল ৫০ শয্যাই। এরপর সর্বশেষ ২০১৮ সালে জেলার প্রায় ১৬ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতে ১০০ শয্যার হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, রোগীদের চাপ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। এছাড়া দুপুর ২টার পরে শুধু জরুরি বিভাগে মাত্র একজন চিকিৎসক ব্যতীত অন্য কোনো চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। রোগীদের চাপে ওয়ার্ডে যথাযথ চিকিৎসা সেবা দিতে পারছেন না নার্সরা। যারাও দায়িত্ব পালন করছেন তাদের ব্যবহারও রোগিদের সাথে ছিল খুবই খারাপ ও অসন্তোষজনক এ অভিযোগ রোগি ও তাদের স্বজনদের।
অন্যদিকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের জন্য স্বল্প মূল্যে সরকারিভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালে তেমন কোনো পরীক্ষা করানো যায় না। তাই বাধ্য হয়েই দুই থেকে তিনগুণ বেশি টাকা খরচ করে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয় রোগীদের। এতে বিড়ম্বনায় পড়েন চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের জন্য মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উন্নত চিকিৎসার আশায় আসা নালিতাবাড়ী উপজেলার বৃদ্ধ আব্দুল হক জানান, গতকাল (২৫ অক্টোবর) সকালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি এখন পর্যন্ত কোন ডাক্তার পাইনি। যদি ২৪ ঘণ্টা ডাক্তার পেতাম তাহলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হতো।
সদর উপজেলার কামারের চর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন জানান, আমাদের শেষ ভরসা শেরপুর সদর হাসপাতাল। ডাক্তার ঠিকমতো আসে না। এতে আমরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। এছাড়া সবগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা যদি হাসপাতালেই করাতে পারতাম তাহলে আমাদের জন্য অনেক উপকার হতো। ডাক্তার ওয়ার্ডে এসে শুধু টেস্ট লিখে দিচ্ছেন। এখন প্রাইভেট ক্লিনিকে টেস্ট করতে হবে।
হাসপাতালে ভর্তি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রোগি জানান, হাসপাতালে চুরির ভয় দিন দিন বাড়তেছে, গেল দিনও আমার পাশের রোগির মোবাইল চুরি হয়ে গেছে। সেই সাথে দালালরা হাসপাতালে এসে নানা প্রলোভন দেখে রোগী নিয়ে যায় বাইরের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোহাম্মদ সাজ্জাৎ হোসেন বলেন, আমরা সীমিত সংখ্যক লোকবলের মধ্যেও যথাসম্ভব রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। কাগজে কলমের ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে দ্রুত লোকবল নিয়োগ জরুরী হয়ে পড়েছে। আজ (২৫ অক্টোবর রোববার) বেলা বারোটা পর্যন্ত রোগী ভর্তি রয়েছে ১১ শত প্লাস। তারপরেও আমাদের ডাক্তার ও নার্সরা ক্লান্ত না হয়ে যথাসম্ভব সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

_medium_1793008066.jpg)
_medium_1793007618.jpg)

_medium_1793007169.jpg)
_medium_1793007011.jpg)
_medium_1793006609.jpg)
