পূর্বধলার প্রখ্যাত পীরে কামেল মাওলানা আহমদ হোসাইন আর নেই
নাহিদ আলম, স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪০ দুপুর

নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার প্রখ্যাত পীরে কামেল, শায়খুল হাদিস ও জামিয়া ক্বাওমীয়া দারুল উলুম সেহলা মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা আহমদ হোসাইন ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
আজ শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে উপজেলার হোগলা ইউনিয়নের দামপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। তিনি সাত ছেলে ও চার মেয়েসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী, ভক্ত ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে তিনি শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জটিল রোগে ভুগছিলেন। গত ২৬ মার্চ তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে প্রথমে তাঁকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কয়েক দিন চিকিৎসার পর অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি হাসপাতাল নেক্সাসে নেওয়া হয় এবং আইসিইউতে রাখা হয়। পরবর্তীতে তিনি কোমায় চলে যান। অবস্থার অবনতি হলে বৃহস্পতিবার চিকিৎসক ও পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মরহুমের জানাজার নামাজ আজ (শুক্রবার) বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে সেহলা মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হবে।

মাওলানা আহমদ হোসাইন ১৯৩৩ সালে পূর্বধলা উপজেলার হোগলা ইউনিয়নের দামপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মাওলানা আব্দুল মান্নান। তিনি নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং পরে ঘাগড়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে সেহলা ক্বাওমি মাদরাসায় ভর্তি হন।
উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তিনি বালিয়া, ইসলামপুর ও সোহাগী মাদরাসায় অধ্যয়ন করেন এবং সোহাগী মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি মেধা, অধ্যবসায় ও নৈতিকতার জন্য সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে প্রশংসিত হন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার টিলাটিয়া মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে। সেখানে তাঁর দক্ষ পাঠদান, গভীর জ্ঞান ও সহজবোধ্য ব্যাখ্যার কারণে দ্রুত সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে তিনি জামিয়া ক্বাওমীয়া দারুল উলুম সেহলা মাদরাসায় যোগ দেন।
বর্ণাঢ্য জীবনে ঐতিহ্যবাহী সেহলা মাদরাসায় তিনি দীর্ঘ ৬০ বছরেরও বেশি সময় শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠানের শায়খুল হাদিস ও প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে মাদরাসাটি এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য ছাত্র বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে আলেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সহিহ বুখারির দরস প্রদান করেছেন, যা তাঁকে হাদিসশাস্ত্রে একজন বিশেষজ্ঞ আলেম হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়। ইলমে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে তাঁর অবদান স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তিনি আধ্যাত্মিক জগতেও একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ময়মনসিংহ বড় মসজিদের সাবেক পেশ ইমাম মাওলানা ফয়জুর রহমান (রহ.)-এর কাছ থেকে খেলাফত লাভ করেন। তাঁর অসংখ্য মুরিদ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে। আত্মশুদ্ধি, তরিকত ও নৈতিক জীবন গঠনে তিনি মানুষকে দিকনির্দেশনা দিতেন।
নিভৃতচারী ও সাদাসিধে জীবনযাপনের জন্য তিনি এলাকায় বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন সাদালাপী, মিশুক ও দানশীল। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আন্তরিক ও সহজ। তিনি মানুষের কল্যাণে নীরবে কাজ করে গেছেন।
ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তিনি ইসলামী রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন এবং চারদলীয় জোটের সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মাছুম মোস্তফা, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলহাজ্ব আবু তাহের তালুকদার, সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ্ব বাবুল আলম তালুকদার, ‘আজকের আরবান’-এর প্রকাশক ও সম্পাদক সৈয়দ আরিফুজ্জামান মাসুম, পূর্বধলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. জায়েজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক কেবিএম নোমান শাহরিয়াসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, আলেম-ওলামা, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁরা মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
মাওলানা আহমদ হোসাইনের মৃত্যুতে পূর্বধলা উপজেলাসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ধর্মীয় অঙ্গনে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।







