১ কোটি ২১ লাখ দেশি পশু দিয়েই কোরবানির প্রস্তুতি

0
75

আরবান ডেস্ক : আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় দেশি পশু দিয়েই কোরবানির সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সরকার। চলতি বছর ১ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার ৩৮৯টি কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ২ লাখ ৭ হাজার বেশি। দেশীয় পশুতে চাহিদা পূরণ হওয়ায় দেশের বাইরে থেকে গরু আনা বন্ধে কঠোর অবস্থানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু মজুত আছে, তাই এ বছরও কোরবানিতে বাইরের দেশ থেকে একটি পশুও আসবে না। আমাদের যে পরিমাণ পশু উৎপাদন হচ্ছে সেটি চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকে। গত বছর কোরবানিতে উৎপাদিত গরুর এক-দশমাংশ বিক্রি হয়নি। এর সঙ্গে চলতি বছরের জন্য উপযুক্ত পশু মিলে অনেক পশু খামারিদের হাতে রয়েছে। দেশের খামারি এবং গৃহস্তের কাছে থাকা গবাদিপশু দিয়ে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের মতো এবারও গবাদিপশুর পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। চলতি বছর ১ কোটি ২১ লাখ ২৪ হাজার পশুর মধ্যে গরু ও মহিষের সংখ্যা ৪৬ লাখ ১১ হাজার ৩৮৩টি। গরু-মহিষের এ সংখ্যার মধ্যে হৃষ্টপুষ্ট গবাদিপশু রয়েছে ৪২ লাখ ৪০ হাজার ৪৯৩টি আর গৃহপালিত গবাদিপশুর সংখ্যা ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৯০। ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৭৫ লাখ ১১ হাজার ৫৯৭, যার মধ্যে হৃষ্টপুষ্ট ছাগল-ভেড়া রয়েছে ৩৩ লাখ ৪৮ হাজার ৭৪০ আর গৃহপালিত গবাদি ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা ৪১ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৭। এছাড়া উট, দুম্বা ও অন্যান্য পশুর সংখ্যা ১ হাজার ৪০৯টি।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জিনাত সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য আট বিভাগের ৬ লাখ ৮১ হাজার ৫৩২টি খামারের তথ্য অনুযায়ী পশুর পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর খামারিদের কাছ থেকে হৃষ্টপুষ্ট পশু আসবে ঢাকা থেকে ৬ লাখ ৩৭ হাজার ১৯৬টি, চট্টগ্রাম থেকে ১৫ লাখ ১২ হাজার ১১৪, রাজশাহী থেকে ২৭ লাখ ২৮ হাজার ৪৬০, খুলনা থেকে ৮ লাখ ৭৯ হাজার ২৫১, বরিশাল থেকে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৩, সিলেট থেকে ১ লাখ ৬৬ ৩৫৩, রংপুর থেকে ১০ লাখ ৩ হাজার ২৮১ ও ময়মনসিংহ থেকে আসবে ২ লাখ ৯ হাজার ৩৪৪টি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছর পবিত্র ঈদুল আজহায় সারাদেশে ৯০ লাখ ৯৩ হাজার পশু কোরবানি হয়েছে। যার মধ্যে ৪০ লাখ ৫৩ হাজার ৬৭৯টি গরু-মহিষ, ৫০ লাখ ৩৮ হাজার ৮৪৮টি ছাগল-ভেড়া ও অন্যান্য ৭১৫টি গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৯ লাখ ৭৩ হাজার ৮৩৩টি গরু-মহিষ, ১২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬টি ছাগল-ভেড়া ও অন্যান্য ৩৬৩টিসহ মোট ২২ লাখ ৩৯ হাজার ২৫২টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ১০ লাখ ৭১ হাজার ২৩১টি গরু-মহিষ, ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮৬টি ছাগল-ভেড়া ও অন্যান্য ২০১টিসহ মোট ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ৫১৮টি, রাজশাহী বিভাগে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৭৩৩টি গরু-মহিষ, ১২ লাখ ১৬ হাজার ২৮৩টি ছাগল-ভেড়া ও অন্যান্য ১২৯টিসহ মোট ১৮ লাখ ৩৩ হাজার ১৪৫টি, খুলনা বিভাগে ২ লাখ ৩৯ হাজার ১৪৭টি গরু-মহিষ, ৬ লাখ ১৮ হাজার ৪৪৩টি ছাগল-ভেড়া ও অন্যান্য ১১টিসহ মোট ৮ লাখ ৫৭ হাজার ৬০১টি, বরিশাল বিভাগে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৬২১টি গরু-মহিষ, ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৮টি ছাগল-ভেড়াসহ মোট ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯৭৯টি, সিলেট বিভাগে ২ লাখ ৯ হাজার ৫৬৯টি গরু-মহিষ, ১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৬৪টি ছাগল-ভেড়া ও অন্যান্য ৮টিসহ মোট ৪ লাখ ৮ হাজার ৯৪১টি, রংপুর বিভাগে ৪ লাখ ৯৬ হাজার ২২০টি গরু-মহিষ, ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৬৩৯টি ছাগল-ভেড়াসহ মোট ১০ লাখ ৪৪ হাজার ৮৫৯টি এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১ লাখ ৮০ হাজার ৩২৫টি গরু-মহিষ, ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬১৯টি ছাগল-ভেড়া ও অন্যান্য তিনটিসহ মোট ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪৭টি গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে। আগামী ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন। আমাদের গবাদিপশুর বৃহৎ একটি অংশ পাবনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও যশোর অঞ্চল থেকে ঢাকার ওপর দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যায়। পরিবহন খরচ কিন্তু উল্লেখযোগ্য অংশ, তাদের ট্রাক আগে যেখানে তিন-চারদিন ফেরীর অপেক্ষায় থাকত। এবার সেসব সমস্যা আমাদের থাকবে না, নির্বিঘ্নে পশু পরিবহন হবে। পরিবহন খরচটা কিন্তু তাদের মিনিমাইজ হবে। খাদ্যমূল্য বেশি ঠিক, তবে আমাদের ক্রয়মূল্য বেড়েছে।
২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ লাখ ৪৭ হাজার গরু-মহিষ, ৭৩ লাখ ৬৫ হাজার ছাগল-ভেড়া এবং অন্যান্য ৪ হাজার ৭৬৫ পশুসহ মোট ১ কোটি ১৯ লাখ ১৬ হাজার ৭৬৫টি কোরবানিযোগ্য গবাদিপশু ছিল। ২০২০ সালের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০টি। এর মধ্যে প্রায় ৯৪ লাখ ৫০ হাজার ২৬৩টি পশু কোরবানি করা হয়েছিল।
গত বছর করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সরকার অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গবাদিপশু ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম গ্রহণ করে। সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আইসিটি বিভাগসহ অন্যান্য দপ্তর-সংস্থা, জেলা-উপজেলা প্রশাসন, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ অন্যান্য বেসরকারি সংগঠন ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে গবাদিপশুর ডিজিটাল হাট পরিচালনা করে। যার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর অনলাইনে মোট ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭৯টি গবাদিপশু বিক্রয় হয়েছে যার আর্থিক মূল্য ২ হাজার ৭৩৫ কোটি ১১ লাখ ১৫ হাজার ৬৭৮ টাকা। গত বছর অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গবাদিপশু বিক্রয় হয়েছিল ৮৬ হাজার ৮৭৪টি, যার আর্থিক মূল্য ছিল ৫৯৫ কোটি ৭৬ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪ হাজার ৮২৯ টাকা, যা এর আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বেশি। এ বছরও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গবাদিপশু ক্রয়-বিক্রয়ের পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মনজুর মোহাম্মদ শাহাজাদা জাগো নিউজকে বলেন, ‘চলতি বছর কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ কোটি ২১ লাখের বেশি, যা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত। ধারণা করছি গতবারের তুলনায় এবার কোরবানি বেশি হবে। গতবার যেই সিচ্যুয়েশন ছিল তার থেকে কিন্তু আমরা ওভারকাম করেছি। গত বছর অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্যেও কিন্তু প্রায় ৯১ লাখ গবাদিপশু কোরবানি হয়েছে, এবার হয়তো তার চেয়ে বেশিই হবে। এ বছর যেন কোরবানির পশুর অভাব না হয় সেই প্রস্তুতি কিন্তু আমাদের রয়েছে। অনলাইনে পশু বিক্রির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। যারা হাটে যেতে চান না, তারা যেন অনলাইন থেকে গবাদিপশু সংগ্রহ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে আমরা আরেকটি বিষয়ে নজর রাখি যেমন অনলাইনে কিনতে গিয়ে কেউ যেন প্রতারিত না হন। কারণ গত বছর এ অভিজ্ঞতাটি সবার জন্যই নতুন ছিল। এবারও চাচ্ছি অনলাইন থেকে পশু কিনে যেনো কেউ প্রতারিত না হন।’
গরুর মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পশুর দাম অনেক বেশি থাকবে আমি সেভাবে এটি বলতে চাই না। আগামী ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু উদ্বোধন করবেন। আমাদের গবাদিপশুর বৃহৎ একটি অংশ পাবনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুর ও যশোর অঞ্চল থেকে ঢাকার ওপর দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যায়। পরিবহন খরচ কিন্তু উল্লেখযোগ্য অংশ, তাদের ট্রাক আগে যেখানে তিন-চারদিন ফেরির অপেক্ষায় থাকত। এবার সেসব সমস্যা আমাদের থাকবে না, নির্বিঘ্নে পশু পরিবহন হবে। পরিবহন খরচটা কিন্তু তাদের মিনিমাইজ হবে। খাদ্যমূল্য বেশি ঠিক, তবে আমাদের ক্রয়মূল্য বেড়েছে। সবকিছুর সমন্বয়ে আমরা আশা করছি সহনীয় পর্যায়ে থাকবে। অনেক মূল্য হবে তা কিন্তু নয়।’
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু মজুত আছে, তাই এ বছরও কোরবানিতে বাইরের দেশ থেকে একটি পশুও আসবে না। আমাদের যে পরিমাণ পশু উৎপাদন হচ্ছে সেটি চাহিদা মিটিয়েও উদ্বৃত্ত থাকে। গত বছর কোরবানিতে উৎপাদিত গরুর এক-দশমাংশ পশু বিক্রি হয়নি। এর সঙ্গে চলতি বছরের জন্য উপযুক্ত পশু মিলে অনেক পশু খামারিদের হাতে রয়েছে। দেশের খামারি এবং গৃহস্থের কাছে থাকা গবাদিপশু দিয়ে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চলতি বছর করোনা পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। গত বছরের মতো খামারিদের গরু নিয়ে ফিরে যেতে হবে না। উপযুক্ত দামেই গরু বিক্রি করতে পারবেন। বর্ডার এরিয়ায় আরও কঠোর হতে বিভিন্ন সংস্থাকে নির্দেশনা দিচ্ছি, যাতে আমাদের দেশে বাইরের পশু না আসে। বাইরের পশু রোগ নিয়ে এলে সেটি ছড়িয়ে যেতে পারে। করোনা থেকে যাতে সমস্যা না হয় সেজন্য আমরা অনলাইনে পশু বিক্রির ব্যবস্থা করেছিলাম। এবার সেই প্রক্রিয়াও থাকবে, হাট-বাজারেও বিক্রি হবে।’

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here