স্ত্রীর সঙ্গে শয্যাযাপনের শিষ্টাচার

0
44

আরবান ডেস্ক : স্ত্রীর সঙ্গে শয্যাযাপন যাপিত জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। কিন্তু মুসলমানরা এ ক্ষেত্রেও ইসলামের বিধি-নিষেধের আওতাধীন। স্ত্রী হলেন ‘পার্টনার অব লাইফ’। এক ছাদের নিচে আমৃত্যু থাকার স্বপ্ন নিয়ে মানুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়।
সুতরাং বৈবাহিক জীবনের সব কাজ হতে হবে আন্তরিকতা, সতর্কতা, হৃদ্যতা ও মমতা জড়ানো। তাই ইসলামের নির্দেশনা হলো—‘…স্ত্রীদের সঙ্গে সৎভাবে জীবন যাপন করবে…। ’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
এখানে স্ত্রীর সঙ্গে শয্যাযাপনের ইসলামী শিষ্টাচার নিয়ে আলোচনা করা হলো—
সহবাসকালে দোয়া পাঠ করা : সহবাসের সময় রাসুল (সা.) নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করতে বলেছেন, উচ্চারণ : বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইতানা ওয়া জান্নিবিশ শাইতানা মা রাজাকতানা।
অর্থ : আল্লাহর নামে শুরু করছি। হে আল্লাহ! আমাদের শয়তানের প্রভাব থেকে দূরে রাখুন এবং আমাদের যে সন্তান দান করবেন তাদের শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখুন। (বুখারি, হাদিস : ১৪১, ৩২৭১)
এই দোয়া পাঠ করে সহবাস করলে আল্লাহ যদি ওই স্বামী-স্ত্রীকে কোনো সন্তান দান করেন, তাহলে শয়তান সন্তানের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। (বুখারি, হাদিস : ১৪১, ৩২৭১)
সহবাসে স্বাচ্ছন্দ্যময় পদ্ধতি গ্রহণ : সহবাসের ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীর সম্মুখভাগে যেদিক দিয়ে ইচ্ছা সহবাস করতে পারে। উম্মু সালামা (রা.) বলেন, মুহাজিররা মদিনায় এসে আনসার নারীদের বিবাহ করলেন। মুহাজির নারীরা চিত হয়ে শয়ন করত। কিন্তু আনসার নারীরা চিত হয়ে শয়ন করত না। একবার এক মুহাজির ব্যক্তি তার আনসার স্ত্রীকে এরূপ করার ইচ্ছা করলে সে রাসুলকে (সা.) জিজ্ঞেস না করে তা করতে অস্বীকৃতি জানাল। উম্মু সালামা (রা.) বলেন, ওই নারী রাসুল (সা.)-এর কাছে এলো, কিন্তু তাঁকে জিজ্ঞেস করতে লজ্জাবোধ করল। তাই উম্মু সালামা (রা.) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন। এমন প্রেক্ষাপটে একটি আয়াত নাজিল হয়। আয়াতটি হলো—‘তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের জন্য শস্যক্ষেতস্বরূপ। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছা আগমন করো। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৩)
এ আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসুল (সা.) বলেন, না, শুধু একই রাস্তায় সহবাস করা যাবে। (মুসনাদ আহমাদ, ৭/৬১)
অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘স্ত্রীর কাছে আসো সম্মুখ ও পেছন উভয় দিক দিয়ে—যদি তা লজ্জাস্থান হয়। ’ (তাবরানি, কাবির, ৭/৬২)
নিষিদ্ধ স্থানে সহবাস করা যাবে না : স্ত্রীর পায়ুপথে সহবাস করা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ (কিয়ামতের দিন) ওই ব্যক্তির দিকে (রহমতের দৃষ্টিতে) তাকাবেন না যে তার স্ত্রীর পায়ুপথে সহবাস করে। (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ৬৩৯)
তিনি আরো বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ হকের ব্যাপারে লজ্জাবোধ করেন না। কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন। তোমরা নারীদের পায়ুপথে সহবাস কোরো না। (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ১৯২৪)
নিষিদ্ধ সময়ে সহবাস না করা : ঋতু অবস্থায় স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করা হারাম। আল্লাহ বলেন, ‘আর লোকেরা তোমাকে প্রশ্ন করছে নারীদের ঋতুস্রাব সম্পর্কে। তুমি বলো, ওটা হলো কষ্টদায়ক বস্তু। অতএব ঋতুকালে স্ত্রীসঙ্গ থেকে বিরত থাকো। পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না। অতঃপর যখন তারা ভালোভাবে পবিত্র হবে, তখন আল্লাহর নির্দেশমতে তোমরা তাদের কাছে গমন করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন। ’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোনো ঋতুমতী স্ত্রীর সঙ্গে কিংবা তার পায়ুপথে সংগম করে অথবা গণকের কাছে যায় এবং তার কথা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা অস্বীকার করল। (ইবনু মাজাহ, হাদিস : ৬৩৯)
আর ঋতুমতী স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস ছাড়া সব কিছু বৈধ। রাসুল (সা.) বলেন, তোমরা তাদের সঙ্গে (তাদের হায়েজ অবস্থায়) একই ঘরে অবস্থান ও অন্য কাজ করতে পারো শুধু সহবাস ছাড়া। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৮, ২১৬৫)
সহবাসের পর অজু করা : সহবাসের পরে ঘুমাতে ও পানাহার করতে চাইলে কিংবা পুনরায় মিলিত হতে চাইলে মধ্যখানে অজু করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তিন ব্যক্তির কাছে ফেরেশতা আসে না; কাফির ব্যক্তির লাশ, জাফরান ব্যবহারকারী এবং অপবিত্র ব্যক্তি—যতক্ষণ না সে অজু করে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪১৮০)
সহবাসের পর প্রস্রাব ও লজ্জাস্থান ধৌত করা : সহবাসের পর প্রস্রাব করা স্বস্তিদায়ক ও রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। এবং লজ্জাস্থান ধৌত করা সুন্নত। এটিও রোগ প্রতিরোধের অনুকূল। আয়েশা (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) যখন অপবিত্র অবস্থায় ঘুমাতে ইচ্ছা করতেন তখন তিনি লজ্জাস্থান ধুয়ে সালাতের অজুর মতো অজু করতেন। (বুখারি, হাদিস : ২৮৮)
সম্ভব হলে ঘুমের আগে অপবিত্রতার গোসল করা : আবদুল্লাহ বিন কায়েস বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, নবী করিম (সা.) অপবিত্র অবস্থায় কিরূপ করতেন? তিনি কি ঘুমের আগে গোসল করতেন, নাকি গোসলের আগে ঘুমাতেন? আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি উভয়টি করতেন। কখনো গোসল করে ঘুমাতেন, আবার কখনো অজু করে ঘুমাতেন। আমি বললাম, সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি মানুষের কর্মে প্রশস্ততা দান করেছেন। (তিরমিজি, হাদিস : ৪৪৯)
অন্য হাদিসে এসেছে, একবার নবী করিম (সা.) তাঁর একাধিক স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করলেন। তিনি এর কাছে গোসল করলেন এবং ওর কাছেও গোসল করলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাঁকে বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি তাকে একটি গোসলে পরিণত করতে পারলেন না? তিনি বলেন, এটা অধিকতর পরিচ্ছন্ন, অতি উত্তম ও সর্বাধিক পবিত্রতা। (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৯)
স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে গোসল করা : স্বামী-স্ত্রীর এক স্থানে একত্রে গোসল করা বৈধ। আয়েশা (রা.) বলেন, আমি ও আল্লাহর রাসুল (সা.) উভয়েই একই পাত্র থেকে গোসল করতাম। এমনকি আমি বলতাম আমার জন্য রাখেন, আমার জন্য রাখেন। আয়েশা (রা.) বলেন, তাঁরা উভয়ে অপবিত্র অবস্থায় ছিলেন। (মুসলিম, হাদিস : ৩২১)

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here