ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ৫৩তম প্রয়াণ দিবস

0
31

সুহাদা মেহজাবিন : ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ উপমহাদেশের স্মরণীয় বাঙালি ব্যক্তিত্ব, বহুভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। বিবিসি বাংলার জরিপে শীর্ষ ২০ বাঙালির তালিকায় তিনি ১৬তম স্থানে রয়েছেন। এই জ্ঞানতাপসের ৫৩তম প্রয়াণ দিবস আজ।
১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই তিনি ঢাকায় পরলোক গমন করেন। শহীদুল্লাহ্ হলের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। ভাষার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তার সম্মানার্থে, ওই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ঢাকা হলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ হল।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জন্ম ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা নামক গ্রামে।
একাধারে শিক্ষাবিদ, ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক, আইনজীবী, অনুবাদক, কবি, সাহিত্যিক, লোকবিজ্ঞানী, দার্শনিক, জ্ঞানতাপস ও ভাষাসৈনিক হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের মনের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি’। তার এ বাণীই প্রমাণ করে যে বাঙালি জাতির প্রতি তার কত ভালোবাসা এবং তিনি কতটা মহৎ, দেশপ্রেমিক ও অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব।
জীবদ্দশায় ইংরেজি, লাতিন, আরবি, উর্দু, ফারসি, জার্মানি, ফরাসি, হিব্রু, গ্রিক, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, সিংহলি, সিন্ধিসহ প্রায় ২৪টি ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। তন্মধ্যে ১৮টি ভাষাতেই অসাধারণ পাণ্ডিত্য ছিল এবং সেই ভাষাগুলোতে তিনি অনর্গল বক্তৃতা দিতে পারতেন। তিনি চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া নামে পরিচিত ছিলেন।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ তার শিক্ষাজীবন শুরু করেছিলেন গ্রামের এক মক্তব থেকে। তিনি মীর মশাররফ হোসেনসহ বেশ কিছু লেখকের শিশুপাঠ্য বইসমূহ মক্তবেই পড়েছিলেন। মক্তবের বাইরে অন্যান্য শিক্ষা তিনি প্রাপ্ত বয়সে শুরু করেছিলেন। মক্তবের পড়া শেষ করে হাওড়া জিলা স্কুলে ভর্তি হন। তখন থেকেই তার ভাষা শেখার আকাঙ্ক্ষা জন্মে। স্কুলে থাকতেই তিনি আরবি, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি ও উড়িয়া শিখেছিলেন। এমনকি গ্রিক ভাষাও শেখা শুরু করেছিলেন। মূলত ভাষা শেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তার স্কুলের শিক্ষক আচার্য হরিনাথ দের কাছ থেকে।
১৯০৪ সালে হাওড়া জিলা স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাস করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯০৬ সালে এফ এ পাস করেন। ১৯১০ সালে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বিএ এবং ১৯১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত নিয়ে এমএ ডিগ্রি করতে চাইলে ওই বিভাগের এক অধ্যাপক মুসলিম ছাত্রকে সংস্কৃত পড়াতে অস্বীকার করেন। এ জন্য একধরনের বাধ্য হয়েই তিনি ভাষাতত্ত্ব নিয়েই পড়ার চিন্তা করেন।
১৯১৪ সালে বি এল পাস করে, ১৯১৫ সালে তিনি সীতাকুণ্ড হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯১৫ সালের পর নিজ এলাকায় আইন ব্যবসা শুরু করলে অল্প সময়েই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন এবং পরবর্তীকালে পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হয়েছিলেন শহীদুল্লাহ্‌।
১৯১৯ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সহকর্মী হিসেবে একটি গবেষণার কাজ করেন এবং এ সময় বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে লেখা তাঁর কিছু প্রবন্ধ একটি জার্নালে প্রকাশিত হলে শিক্ষিত সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জিও সেগুলো দেখে অনেক সন্তুষ্ট হন এবং শহীদুল্লাহ্‌কে উৎসাহ দেন। এ জন্যই ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থটি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ তাকেই উৎসর্গ করেছেন।
১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার শুরুতেই তিনি এখানে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ পান। পাশাপাশি তিনি দুই বছর আইন বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষকতার দায়িত্বও পালন করেছেন। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত হয়েছে। এখানে শিক্ষাদানকালে তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি নিয়ে মৌলিক গবেষণা করেন এবং ১৯২৫ সালেই প্রমাণ করেন যে বাংলা ভাষার উৎপত্তি গৌড়ী বা মাগধী প্রাকৃত থেকে।
১৯২৬ সালে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ ভাষাতত্ত্বে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ফ্রান্সে যান এবং প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত, বৈদিক ও প্রাকৃত ভাষার ওপর পড়াশোনা করেন এবং জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েছেন তিনি। পরবর্তীকালে সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ওই বছরই ধ্বনিতত্ত্বে গবেষণার জন্য প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে, দেশে ফিরে আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। সংস্কৃত ও বাংলা ভেঙে আলাদা আলাদা বিভাগ হলে ১৯৩৭ সালে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং ১৯৪৪ সালে অবসর নেন।
অবসর গ্রহণের পরেই ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হন। ১৯৪৮ সালে তিনি আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হন এবং বিভাগীয় প্রধান ও কলা অনুষদের ডিন হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের (ফার্সি ভাষার) খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। তা ছাড়া তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে তিন বছর অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৬৭ সালে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৪০। তিনি ৪১টি পাঠ্যবইও লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যের ওপর তার লিখিত প্রবন্ধ রয়েছে ৬০টির বেশি। ভাষাতত্ত্বের ওপর তার ৩৭টি রচনা রয়েছে। তা ছাড়া তিনি ৩টি ছোটগল্প এবং ২৯টি কবিতাও লিখেছিলেন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অসামান্য কাজ করেছিলেন সেটি হলো, বাংলা একাডেমি থেকে আঞ্চলিক ভাষার অভিধান বের করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা। রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম, অমিয় শতক ও দীওয়ানে হাফিজসহ তাঁর ১১টি অনুবাদগ্রন্থ রয়েছে। তার লিখিত বিখ্যাত তিনটি শিশুতোষ গ্রন্থ রয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও বাংলা সাহিত্যের কথা (দ্বিতীয় খণ্ড) ইত্যাদি।
সারা জীবনের অসাধারণ সব কৃতিত্বের জন্য ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ পেয়েছেন অসংখ্য উপাধি, পদক ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে ফ্রান্স সরকার কর্তৃক প্রদানকৃত ‘নাইট অব দ্য অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ উপাধি, ঢাকা সংস্কৃত পরিষদ কর্তৃক ‘বিদ্যাবাচস্পতি’ উপাধি, ‘প্রাইড অব পারফরম্যান্স পদক’ (১৯৫৮), মরণোত্তর ‘হেলাল ই ইমতিয়াজ খেতাব’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মরণোত্তর ‘ডি লিট’ উপাধি, ১৯৮০ সালে মরণোত্তর ‘স্বাধীনতা পদক’ উল্লেখযোগ্য।
পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা এবং পশ্চিম পাকিস্তানে পশতু, পাঞ্জাবি, বেলুচি ও সিন্ধি ভাষা থাকা সত্ত্বেও এবং পুরো পাকিস্তানে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরও পাকিস্তানি শাসকেরা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার যে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌ তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।
মাতৃভাষা বাংলার প্রতি তার ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। তিনি বলেছিলেন, ‘যে জাতি তার ভাষাকে শ্রদ্ধা করে না, সে জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।’

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here