Home শীর্ষ সংবাদ একজন সৎ, সাহসী ও কর্তব্যনিষ্ঠ নির্বাহী অফিসারের বিদায়

একজন সৎ, সাহসী ও কর্তব্যনিষ্ঠ নির্বাহী অফিসারের বিদায়

সৈয়দ আরিফুজ্জামান: নমিতা দে পূর্বধলা উপজেলায় নির্বাহী অফিসার হিসাবে ২ বছর ৭ মাস অতিবাহিত করেন। কর্মতৎপরতা, বিচক্ষণতা, দৃঢ় মনোবল ও সাহসীকতার সাথে দায়িত্ব পালন সত্যিই যেকোন কর্মকর্তার জীবনে এক বর্ণাঢ্য অধ্যায়।
প্রশাসনকে জনগণের দোরগোরায় নিয়ে সেবা দেয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ১৯৮৩ সালে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তন। সেই সময় থেকে উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাঠ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা হিসেবে জনকল্যাণে সরকারের সেবাদানকারি প্রতিষ্ঠান সমূহের নেতৃত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
হাওর, নদী, খাল, বিল ও অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা দেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের জেলা নেত্রকোনার অন্যতম একটি সমৃদ্ধ জনপদ পূর্বধলা উপজেলা। ১১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা (পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত রয়েছে) নিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত ৩০৮ বর্গ কিঃ মিঃ আয়তনের এই জনপদের রয়েছে শিক্ষা, ক্রিড়া, মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। অনেক প্রতিথযশা গুণীজনের অবদানে আলোকিত এই জনপদ।
এমন একটি সম্ভাবনাময় জনপদের বর্তমান প্রজন্মকে উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের উন্নয়নমূলক নানামূখী কর্মসূচী বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরকারি দপ্তর, স্থানীয় সরকার, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ও সূধী সমাজসহ গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সমূহকে সম্পৃক্ত করে এলাকার সার্বিক উন্নয়নে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
উপজেলা পদ্ধতি প্রবর্তনের পর পূর্বধলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে নমিতা দে তেইশতম আর নারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে প্রথম। তিনি গাজিপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় ১৯৮৩ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ২০০১-২০০২ সেশনে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকারের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ২৮ তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। রাজশাহী, পাবনা, ঝালকাঠি, নলছিটি ও মুক্তাগাছায় সরকারের বেশকিছু পদে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ৫ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে পূর্বধলা উপজেলায় যোগদান করেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার নমিতা দে কেমন করে মাঠ প্রশাসনের প্রতিনিধি হিসেবে সর্বমহলে প্রিয়ভাজন একজন কর্মকর্তা হয়ে উঠলেন তা তার দায়িত্ব পালনের কতিপয় বিবরণ থেকে স্পষ্ট অনুধাবন করা যায়।
যোগদান করে প্রথমেই তিনি গুরুত্ব দিলেন সরকারি দপ্তর সমূহের মধ্যে সমন্বয় ও গতিশীলতা বৃদ্ধির দিকে। নজর দিলেন প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা আর সহকর্মীদের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায়। নাগরিকদের কাংখিত সেবা প্রাপ্তির পরিবেশ সৃষ্টিতে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে জোড়ালো ভূমিকা রাখলেন। তার কার্যালয়ে সেবা প্রত্যাশিদের সহজ প্রবেশাধিকার জনতুষ্ঠির অন্যতম একটি দিক।
পদক্ষেপ নিলেন সরকারি অর্থের অপচয় রোধ ও আর্থিক শৃংখলার প্রতি। প্রথমেই নিজ কার্যালয়ের স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বিচক্ষনতার সাথে এক সহকর্মীর বড় ধরনের আর্থিক কেলেংকারি উদঘাটন ও অর্থ উদ্ধারে তড়িৎ পদক্ষেপ পূর্বধলায় তার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের এক আলোচিত ঘটনা ।
ক্রিড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে উজ্জিবীত করে যুবসমাজ ও সামাজিক সংগঠন সমূহকে ব্যাপকভাবে সামাজিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করার প্রয়াস বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শুধু পৃষ্ঠপোষকতাই নয় নিজে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে তিনি ইতিমধ্যে যুবসমাজের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।
নমিতা দে পূর্বধলায় স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কিশোরীদের জন্য যেন একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক। বিশেষ করে বাল্য বিবাহ থেকে কিশোরীদের রক্ষা করতে তার রয়েছে জোড়ালো পদক্ষেপ। গভীর রাত্রেও তার মুঠোফোনে কল আসে কোন অপ্রাপ্ত বয়সী কিশোরীর কাছ থেকে, অপরিণত বয়সে বিয়ের হাত থেকে উদ্ধার করতে। রাতেই তিনি ছুটে যান প্রত্যন্ত গ্রামে দায়িত্ব পালনে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে এরই মধ্যে তিনি বাল্যবিবাহমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় তার বরাদ্দের সঠিক বন্টনে যথাযথ নীতিমালা অনুসরণ করে তিনি প্রকৃত সেবা গ্রহীতাদের আস্থা অর্জনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করে সেবার মান বাড়াতে তার উদ্যোগ লক্ষনীয়। ভিজিএফ, ভিজিডি, ওএমএস, কাবিখা, কাবিটাসহ সরকারের সকল বরাদ্দের সুষ্ঠু বন্টনের তিনি নজির স্থাপন করেছেন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে তার আগ্রহ বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের প্রতি তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এলজিএসপি-৩ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ২ টি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীদের স্কুল ব্যাগ প্রদান ও পর্যায়ক্রমে দরিদ্র এলাকার সকল বিদ্যালয়কে এই প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা করেন। তিনি স্কুলের পুরাতন ভবন মেরামতের প্রতি গুরুত্ব দেন এবং বেশ কিছু বিদ্যালয়ে মিডডে মিল চালু করে প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহে শিক্ষার্থীদের জন্য সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করেন।
কংশ নদের উত্তর পার্শে পূর্বধলা উপজেলার বিচ্ছিন্ন এক জনপদ কালিপুর গ্রাম। এটি মুক্তিযুদ্ধ কালীণ মুক্তাঞ্চল হওয়ায় নমিতা দে তার সার্বিক তত্বাবধানে নির্মান করেন সুন্দর একটি মাটির বাঁধ। বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষা আর যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার্থে বাঁধ নির্মান করে দেয়া এবং প্রতিটি পরিবারে একটি করে স্যোলার বিদ্যৃুৎ সরবরাহ করায় মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাথা কালিপুর গ্রামের প্রতি দায়িত্ব পালনে তার আন্তরিকতা প্রকাশ পায়। যার জন্য গ্রামবাসীসহ সর্ব মহলে তিনি প্রশংসিত হন। গুরুত্ব ও অগ্রাধীকার বিবেচনায় দায়িত্ব পালন তার অসাধারণ একটি গুণ।
সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে জাতীয় দিবস সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে একটি মুক্ত মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘ দিনের। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের দাবীর প্রতি গুরুত্ব দিয়ে উপজেলা চত্ত্বরে তার উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্বলিত স্বাধীনতা স্তম্ভ ও একটি মুক্ত মঞ্চ তৈরি হয়।
এছাড়াও উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে তার দায়িত্ব পালনে গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, হাট-বাজার ও জলমহাল ইজারায় স্বচ্ছতা আনয়ন, ইউনিয়ন কমিউনিটি ক্লিনিক সংস্কার ও সোলার বিদ্যুৎ প্রদানসহ সেবার মান উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ, খাল খনন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিকাজের সুবিধা বৃদ্ধি, মাদক নির্মূলে পদক্ষেপ নেয়াসহ বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রদক্ষেপ গ্রহণ তার প্রশাসনিক যোগ্যতার অন্যতম একটি দিক।
দায়িত্ব পালন ও কর্তব্যনিষ্ঠায় নমিতা দে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের আসনকে ইতোমধ্যে অন্য রকম এক উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। সততার সাথে দায়িত্ব পালন তার পেশাগত বৈশিষ্টের উন্নততর একটি দিক। সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ধৈর্য, সাহস আর বিচক্ষণতার জন্য সকলের কাছে হয়ে উঠেছেন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। মেধা, প্রজ্ঞা আর দৃঢ়চেতা মনোভাবের জন্য পূর্বধলার সর্ব মহলে এখন তিনি প্রশংসিত। অসংগতি আর অনাচার রোধে তার সর্বদা বুদ্ধি দিপ্ত পদক্ষেপ। জনমত নির্বিশেষে তিনি সকলের আস্থাভাজন ও নির্ভরতার স্থান। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যেমন নিবেদিতপ্রাণ তেমনি নিজস্ব দায়িত্ববোধের প্রতি অবিচল। তিনি সদালাপী ও মিশুক। সিদ্ধান্ত গ্রহণে যৌক্তিক এবং সৃষ্টিশীল কাজের পৃষ্ঠপোষকতায় সর্বদা তার উদার মনোভাব।
পেশাগত কর্তব্যনিষ্ঠার স্বীকৃতি স্বরূপ জনগণের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার পাশাপাশি প্রশাসনিক পর্যায়েও তার প্রাপ্তি অনেক। তার নেতৃত্বে ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে পূর্বধলা উপজেলা ই-ফাইলিং এর জন্য সারাদেশে শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাচিত হবার গৌরব অর্জন করে। তিনি ২০১৭ সালে জাতীয় পর্যায়ে আয়োজিত ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এ অংশগ্রহণের জন্য ময়মনসিংহ বিভাগের শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে মনোনিত হন। ২০১৮ সালে জেলা ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলায় পূর্বধলা উপজেলাকে জেলার শ্রেষ্ঠ দপ্তর হিসেবে অধিষ্ঠিত করায় জেলার শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সম্মাননা অর্জন এবং একই বছর ময়মনসিংহ বিভাগীয় উদ্ভাবনী মেলায় শুদ্ধাচার ক্যাটাগরিতে বিভাগের শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সম্মাননা প্রাপ্তি তার অর্জন সমূহের মধ্যে অন্যতম।
এমন করেই নমিতা দে পূর্বধলায় সকলের কাছে হয়ে উঠেছিলেন আস্থাভাজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আর জনবান্ধব মাঠ প্রশাসনের অনন্য প্রতীক।
শেরপুর জেলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ায় গত ২০ জুন ছিল তাঁর পূর্বধলায় শেষ কর্মদিবস। বিদায় অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতায় আর হাটে-মাঠে-ঘাটে ও উপজেলার প্রতিটি প্রান্তরে তাঁকে নিয়ে সাধারণ মানুষের যে আলাপচারিতা তাতেই বোঝা যায় তিনি কতটা জনপ্রিয় অফিসার ছিলেন সকলের কাছে।

Print Friendly, PDF & Email
syed arifuzzamanhttp://www.arban.org.bd/
Md. Syed Arifuzzaman working as social worker and founder of Arban-Activity for the reformation of basic needs. My goal to help underprivileged people to aware about good health, quality education and importance of technical education.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন-

জনপ্রিয় সংবাদ

পূর্বধলায় পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু

মো: জায়েজুল ইসলাম : নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায় আজ বুধবার বিকেলে পানিতে ডুবে মাজহারুল ইসলাম (আড়াই বছর) নামের এক শিশু মারা গেছে। সে...

প্রজাতন্ত্রের একজন জনবান্ধব কর্মকর্তার হঠাৎ প্রত্যাহারে সবাই হতবাক

মঈনউল ইসলাম একজন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। এ পদে নেত্রকোনা জেলায় তাঁর দায়িত্ব পালন প্রায় দুই বছর। দায়িত্বকালীন সংশ্লিষ্টজনদের কাছে তিনি...

পূর্বধলায় সাবেক চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা তারা মিয়ার উপর হামলা, গ্রেপ্তার-১

মো: জায়েজুল ইসলাম : নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও মুক্তিযোদ্ধা তারা মিয়া (৭০) দূবৃত্তদের হামলায় আহত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে...

ভোলার তজুমদ্দিনে শাশুড়ির সহযোগিতায় গৃহবধু ধর্ষনের অভিযোগ

মো: আইয়্যুব আলী, তজুমদ্দিন  প্রতিনিধি : ভোলার তজুমদ্দিনে শাশুড়ীর সহযোগীতায় রাতের আধাঁরে এক লম্পট কর্তৃক গৃহবধুকে জোড়পূর্বক ধর্ষনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৩১...

মতামত

Print Friendly, PDF & Email