অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানবতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু

0
225

বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি শুধু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতাই নন, তিনি ছিলেন মানবতার মুক্তির মহানায়ক। দেশ ছাড়িয়ে তাঁর কর্ম বিশ্বময় মানবতার দূত হিসেবে খ্যাতি এনে দিয়েছে। একারণেই ভালোবেসে বাংলার মানুষ তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। ব্যক্তি জীবনে তিনি আজীবন গণতন্ত্রকামী ছিলেন। চেয়েছিলেন শোষনমুক্ত একটি দেশ গড়তে। চেয়েছিলেন দেশের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন অর্থনৈতিক মুক্তিছাড়া রাজনৈতিক মুক্তির কোন মূল্য নেই। আজন্ম সেই লক্ষ্যে লড়াই সংগ্রাম করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গর্বিত বাবা শেখ লুৎফুর রহমান এবং গর্বিত মা জননী শেখ সায়রা বেগম। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়, ভাইদের মধ্যে প্রথম। গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। পরে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আই.এ. এবং ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। দেশ বিভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হলেও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি দাওয়ার পক্ষে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করায় আজীবনের জন্য তাকে বহিষ্কার করা হয়। শর্তসাপেক্ষে বহিষ্কার তুলে নেবার প্রস্তাব দিলেও মাথা নত করেননি বঙ্গবন্ধু। পরে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের ১০ আগস্ট এই বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেসার সাথে তাঁর বিয়ে হয় হলেও ২২ বছর বয়সে দাম্পত্য জীবন শুরু করেন। তাদের ২ মেয়ে- আজকের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এবং তিন ছেলে-শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল। কিশোর বয়সেই বঙ্গবন্ধু সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তৎকালীন বাংলা প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জে আসেন। কিশোর মুজিব মুখ্যমন্ত্রীর রাস্তা আটকে স্কুলের ছাদ মেরামতের দাবি জানান। মুখ্যমন্ত্রী মুজিবের সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তৎক্ষনাৎ নিজস্ব তহবিল হতে অর্থ বরাদ্দ দেন। মুখ্যমন্ত্রীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য গঠিত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধু। এ নিয়ে স্থানীয় কংগ্রেসিদের সাথে ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন। এরপর থেকে শুরু হয় তার রাজনৈতিক সংগ্রামী জীবন।শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে গেছেন। শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে, স্বদেশের, স্বজাতির অধিকারের জন্য লড়েছেন। আপামর জনসাধারণের স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। নেতৃত্বগুণ শেখ মুজিবের সহজাত বৈশিষ্ট্য। স্কুলজীবনে বিপ্লবী হামিদ মাস্টারের হাতে দীক্ষা নিয়েছিলেন। প্রিয় শিক্ষক হামিদ মাস্টারের সঙ্গে ধর্মগোলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ছেলেবেলায়ই শেখ মুজিবের ভেতর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার সূত্রপাত হয়। জন্মগতভাবেই শেখ মুজিবর রহমানের ছিল অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত, দুঃখী ও মেহনতি মানুষের প্রতি অতি সংবেদনশীল কোমল হৃদয়। শোষিত বঞ্চিত মানুষের এ দুঃখ-বঞ্চনা তাকে গভীরভাবে পীড়া দিত। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র একটি অংশ থেকে যার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যায়- “আমার মনে আছে খুবই গরিব এক বৃদ্ধ মহিলা কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, শুনেছে এই পথে আমি যাব, আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বলল, ‘বাবা আমার এই কুঁড়েঘরে তোমায় একটু বসতে হবে।’ আমি তার হাত ধরেই তার বাড়িতে যাই। অনেক লোক আমার সাথে, আমাকে মাটিতে একটা পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা এনে আমার সামনে ধরে বলল, ‘খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছুই নাই।’ আমার চোখে পানি এল। আমি দুধ একটু মুখে নিয়ে, সেই পয়সার সাথে আরও কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম, ‘তোমার দোয়া আমার জন্য যথেষ্ট, তোমার দোয়ার মূল্য টাকা দিয়ে শোধ করা যায় না।’ টাকা সে নিল না, আমার মাথায় মুখে হাত দিয়ে বলল, ‘গরিবের দোয়া তোমার জন্য আছে বাবা।’ নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল, যখন তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসি। সেই দিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ‘মানুষেরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না।” দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদ লড়াই শুরু হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার কারণে রাজপথ থেকেই গ্রেফতার হন শেখ মুজিবুর রহমান। ১১ মার্চের হরতাল, পিকেটিংসহ কর্মসূচির পুরো রূপরেখা তৈরি করেছিলেন শেখ মুজিব। এর প্রেক্ষিতে ছাত্র ধর্মঘট শুরু হয়, যা চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে।১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান বিভক্ত হওয়ার পরে নতুন গঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ তৎকালীন অনেক নেতাকে এই সংগঠন ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক করে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।শেখ মুজিবুর রহমান ধীরে ধীরে তার দূরদর্শিতা এবং প্রজ্ঞাসম্পন্ন মেধায় একজন কুশলী রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন। ১৯৫৩ সালে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষি মন্ত্রী হন শেখ মুজিবর রহমান । ১৯৫৬ সালে কোয়ালিশন সরকারের মন্ত্রিসভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৬৩ সালে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিব। তিনি ছিলেন আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র তত্ত্বের কট্টর সমালোচক। ১৯৬৬ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর জাতীয় সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফাই যে বাঙালির মনের কথা ছিল, তার চাক্ষুষ প্রমাণ হলো ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচন। ছয় দফা ঘোষণার পাঁচ বছরের মধ্যে নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদ এবং দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়।স্বাধীনতার এই যাত্রা পথে বঙ্গবন্ধু এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি আমৃত্যু লড়েছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় শ্রম ঘাম দেয়ার মাশুল দিয়েছেন নিজের রাজনৈতিক জীবনের অনেকটা সময় কারাগারে কাটিয়ে। পাকিস্তানী শাসন শোষণের পুরোটা সময় বারংবার তাকে জেলবন্দী করে দমিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চলে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়টাও করাচির জল্লাদ কুটীরে দিন গুণছিলেন মৃত্যুর। বঙ্গবন্ধুই বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মৃত্যুর জন্য প্রস্তত, কেউ তাকে মারতে পারে না।’ বিশ্বজনমতের চাপে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে সেই সত্যই প্রমাণ করলেন। তার একমাত্র শক্তি এবং দুর্বলতা ছিলো বাংলার মানুষের প্রতি ভালোবাসা। তিনি বলেছিলেন- “আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার দেশের মানুষকে ভালবাসি, সবচেয়ে বড় দূর্বলতা আমি তাদেরকে খুব বেশী ভালবাসি।” সেই দুর্বলতার সুযোগে কতিপয় বেপথু হায়েনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে জাতির পিতাকে। কিন্তু মৃত্যু দিয়েই তিনি শোধ করেছেন ভালোবাসার দেনা। আমাদের দিয়ে গেছেন সার্বভৌম দেশ ও একটি লাল সবুজের পতাকা। একারণেই বঙ্গবন্ধু আমাদের আদর্শের নাম। বঙ্গবন্ধু একটি সাহসের নাম, একটি প্রেরণার নাম। ১৫ আগস্টের কালো এই দিনে মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার শান্তি কামনা করি। একজন সমাজ কর্মী হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে শোষণমুক্ত জাতি গঠনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথাস্মরণ করে জাতির জনকের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

লেখক : মোঃ উসমান গনি সুমন, চেয়ারম্যান দিলরুবা হাবিব শিক্ষা ফাউন্ডেশন

লেখক : মোঃ উসমান গনি সুমন

চেয়ারম্যান দিলরুবা হাবিব শিক্ষা ফাউন্ডেশন

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here